ইরানের সঙ্গে লেনদেন, আরও ব্যাংকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার
ইরানের সঙ্গে লেনদেন, আরও ব্যাংকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের সঙ্গে আর্থিক ও বাণিজ্যিক লেনদেন বন্ধে চাপ আরও বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে লেনদেনের অভিযোগে চলতি সপ্তাহেই আরও একটি ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। তবে কোন ব্যাংককে লক্ষ্য করা হবে, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন পদক্ষেপ এমন সময়ে আসছে, যখন ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে ওয়াশিংটন নতুন করে ব্যাপক চাপ প্রয়োগ শুরু করেছে। একই সঙ্গে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনাও আবার বেড়েছে। ফলে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাও নতুন করে সামনে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট রোববার নর্থ ক্যারোলাইনার অ্যাশভিলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নতুন ব্যাংক নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি বন্ধ করতেই ওয়াশিংটন কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। প্রয়োজন হলে আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আরও কঠোর চাপ প্রয়োগ করা হবে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।

বেসেন্টের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ইরানের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা করা তৃতীয় দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারিতে রয়েছে। অর্থাৎ কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান ইরানের সঙ্গে লেনদেন চালিয়ে গেলে সেটিকে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে।

ওয়াশিংটনের এই কৌশলের মূল লক্ষ্য ইরানের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রবাহগুলোতে চাপ সৃষ্টি করা। বিশেষ করে তেল বিক্রি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রশাসনের ধারণা, ইরানের বৈদেশিক আয়ের উৎসগুলো সংকুচিত করা গেলে দেশটির সামরিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতার ওপরও চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের অভিযোগে মিসরের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংক বানকু মিসরের সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাখাগুলোকে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের উদ্যোগ নেয়। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে ব্যাংকটির ওই শাখাগুলো মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার হারাতে পারে।

এই পদক্ষেপকে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক অভিযানের প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওয়াশিংটন এই কর্মসূচির নাম দিয়েছে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’। কর্মসূচিটির লক্ষ্য ইরানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আর্থিক যোগাযোগের অবশিষ্ট পথগুলোও সংকুচিত করা।

মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক নেটওয়ার্ককে চিহ্নিত করে তাদের ওপর চাপ বাড়ানো হবে। তেহরানের জন্য বৈদেশিক অর্থের প্রবাহ যতটা সম্ভব কঠিন করে তোলাই এই নীতির কেন্দ্রবিন্দু।

তবে এই উদ্যোগ শুধু ইরানকেই নয়, দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য করা অন্যান্য দেশকেও কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে ফেলতে পারে। বিশেষ করে চীনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চীন ইরানের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দেশটির তেলের বড় ক্রেতা। ফলে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে গিয়ে চীনের সঙ্গে ওয়াশিংটনের নতুন অর্থনৈতিক বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জি-২০ বৈঠকে চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন বেসেন্ট। সেখানে ইরানের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরান থেকে চীনের তেল কেনা অব্যাহত থাকলে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি মার্কিন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, এ ক্ষেত্রে সব ধরনের বিকল্প খোলা রয়েছে।

চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির সম্পর্কেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতা আগে থেকেই রয়েছে। এর মধ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে নতুন আর্থিক নিষেধাজ্ঞা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

অন্যদিকে ভারতও ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখে। ফলে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে গিয়ে ওয়াশিংটনকে মিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। কোনো বড় অর্থনীতিকে সরাসরি নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হলে আন্তর্জাতিক বাজার ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়তে পারে।

ইরানের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে সামরিক সংঘাতের কারণে। সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আবার তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের লরাক দ্বীপের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে নৌমাইন স্থাপনের সম্ভাব্য প্রস্তুতি ঠেকাতেই এই হামলা করা হয়েছে।

ইরান এই হামলাকে আগ্রাসন হিসেবে দেখছে এবং পাল্টা জবাবের ঘোষণা দিয়েছে। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে ইরানের হামলার দাবিও সামনে এসেছে। ফলে সামরিক সংঘাতের সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপ যুক্ত হওয়ায় তেহরানের ওপর বহুমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।

তবে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ইরানের অবস্থানও স্পষ্ট। তেহরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ইরানি কর্তৃপক্ষের মতে, দেশটি দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও বিকল্প বাণিজ্যিক ও আর্থিক পথ তৈরি করেছে।

ইরানের অর্থনীতিতে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব অবশ্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সীমিত হওয়া, তেল বিক্রিতে বাধা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং বিদেশি বিনিয়োগের ঘাটতি দেশটির অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চাপ তৈরি করে আসছে। নতুন করে ব্যাংক ও তৃতীয় দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা বাড়ানো হলে সেই চাপ আরও তীব্র হতে পারে।

তবে এর বিপরীত প্রভাবও রয়েছে। ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে ইরানের ভূমিকা এবং হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্বের কারণে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শুধু ইরানের অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আর জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন এবং ভোক্তা পর্যায়ের পণ্যের দামে।

এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা নীতিকে শুধু ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করার উদ্যোগ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় মার্কিন ডলারের প্রভাব।

ওয়াশিংটনের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো, কতটা কঠোরভাবে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হবে এবং ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা বড় অর্থনীতিগুলোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কতদূর যেতে পারবে। বিশেষ করে চীনের মতো দেশের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা শুধু ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের নিজের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরানের সঙ্গে লেনদেনকারী আরও একটি ব্যাংকের ওপর চলতি সপ্তাহে সম্ভাব্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তাই বৃহত্তর অর্থনৈতিক অভিযানের পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কোন ব্যাংককে লক্ষ্য করা হবে এবং নিষেধাজ্ঞার ধরন কী হবে, তা প্রকাশের পরই এর প্রকৃত প্রভাব সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

এদিকে সামরিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক চাপ একই সময়ে বাড়তে থাকায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকট নতুন এক অনিশ্চিত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। কূটনৈতিক সমাধানের পথ উন্মুক্ত রাখা সম্ভব হবে, নাকি নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে—সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক মহলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত