ইনফান্তিনোকে ঘিরে ফিফায় ক্ষমতার লড়াই তীব্র

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১ বার

প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। সংস্থাটির বর্তমান সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে পদ থেকে সরানোর লক্ষ্যে ফুটবলের প্রভাবশালী কয়েকটি আঞ্চলিক কনফেডারেশন একজোট হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বিশ্ব ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ইনফান্তিনো স্বেচ্ছায় সরে না দাঁড়ালে তাঁকে কার্যত প্রশাসনিকভাবে অকার্যকর করে দিতে ফিফার বিভিন্ন কার্যক্রম বর্জন, গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক বয়কট এবং প্রয়োজনে বিকল্প আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা, উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কনক্যাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ফিফার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং সংস্থার প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে, যা বিশ্ব ফুটবলের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনা। ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে ফিফা এই উদ্যোগ গ্রহণ করলেও ফুটবল মহলের তীব্র সমালোচনার মুখে পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। সমালোচকদের অভিযোগ, ফুটবলের ঐতিহ্য ও বৈশ্বিক স্বার্থের পরিবর্তে বাণিজ্যিক লাভকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। সেই বিতর্কের পর থেকেই ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অসন্তোষ আরও তীব্র হয়েছে এবং তাঁর পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।

ফিফা সভাপতি আগামী মার্চে চতুর্থ মেয়াদের জন্য নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে তাঁর বিরোধীরা ইতোমধ্যেই সম্ভাব্য নির্বাচন সামনে রেখে কৌশল নির্ধারণ শুরু করেছে। তারা মনে করছে, শুধু নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করেও ইনফান্তিনোর অবস্থান দুর্বল করা সম্ভব।

এ লক্ষ্যে যে পরিকল্পনার কথা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ‘গভর্ন্যান্স বয়কট’। এই পরিকল্পনার আওতায় ফিফা কাউন্সিল এবং বিভিন্ন স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অংশ না নেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অনুমোদন থেকে বিরত থাকা এবং সংস্থার কার্যক্রমকে কার্যত স্থবির করে দেওয়ার কৌশল বিবেচনা করা হচ্ছে। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এমন পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে ফিফার প্রশাসনিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়বে।

শুধু প্রশাসনিক বর্জনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না বিরোধী পক্ষের চিন্তাভাবনা। প্রয়োজন হলে ফিফার বাইরে বিকল্প আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। জানা গেছে, উয়েফা ২০১৭ সালেই একটি বৈশ্বিক নেশনস লিগ আয়োজনের পরিকল্পনা তৈরি করেছিল। তখন সেটি বাস্তবায়ন না হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ধারণাকে আবারও সামনে আনার আলোচনা চলছে। যদি বড় বড় ফুটবল শক্তিগুলো বিকল্প প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়, তবে তা ফিফার কর্তৃত্বের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

ফিফার অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সংস্থার ২১১ সদস্য দেশের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫টি দেশ প্রকাশ্যে ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। যদিও ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, তবুও এত সীমিত সমর্থনের তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এদিকে ইউরোপের কয়েকটি জাতীয় ফুটবল সংস্থা ইতোমধ্যেই ইনফান্তিনোর প্রতি দেওয়া আগের সমর্থন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিংবা সে পথে এগোচ্ছে। ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ), ওয়েলস ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, সার্বিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং সুইডিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের অবস্থান পরিবর্তনের খবর ফুটবল অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিশেষ করে ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন গত জুন মাসের শেষ দিকে ইনফান্তিনোর পক্ষে আনুষ্ঠানিক সমর্থনপত্র পাঠালেও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর সেই অবস্থান থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে নেতৃত্বের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও কঠোর পর্যালোচনা প্রয়োজন।

ওয়েলস ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, ২০২৭-২০৩১ মেয়াদের জন্য ফিফা সভাপতি পদে ইনফান্তিনোর প্রার্থিতাকে তারা আর সমর্থন করছে না। সংস্থাটির মতে, সুশাসন, নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অংশীজনদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক ব্যর্থতা তাদের আস্থা নষ্ট করেছে। ফুটবলের বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে না পারার অভিযোগও তারা তুলেছে।

সংকট আরও গভীর হয়েছে আইনি ক্ষেত্রেও। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা ইনফান্তিনোর কাছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আইনজীবীদের মাধ্যমে একটি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে। সেখানে ফিফার ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজেস (এফএফই)’ পরিকল্পনা নিয়ে আইনি ব্যবস্থা, সালিসি কিংবা সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থায় অভিযোগ করার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

নোটিশে আরও বলা হয়েছে, এ পরিকল্পনা-সংক্রান্ত সব নথি, ই-মেইল এবং অন্যান্য তথ্য অবিলম্বে সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো অভ্যন্তরীণ নীতি বা নিয়মিত তথ্য অপসারণ প্রক্রিয়ার অজুহাতে এসব নথি ধ্বংস করা যাবে না। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হলে এসব নথি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে ফিফা গত এক দশকে আর্থিকভাবে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও সংস্থার শাসনব্যবস্থা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে সমালোচনা ক্রমেই বেড়েছে। বিশ্বকাপ সম্প্রসারণ, নতুন ক্লাব বিশ্বকাপ, বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব এবং সম্প্রচারস্বত্ব নিয়ে তাঁর বিভিন্ন উদ্যোগ যেমন প্রশংসা পেয়েছে, তেমনি বিতর্কও সৃষ্টি করেছে।

অন্যদিকে ইনফান্তিনোর সমর্থকদের যুক্তি, বর্তমান নেতৃত্বের অধীনে ফিফার আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ বেড়েছে এবং অনেক ছোট ফুটবল ফেডারেশন আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। তাঁদের মতে, বর্তমান বিরোধিতা মূলত ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের রাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ।

তবে ফুটবল বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী কয়েক মাসই নির্ধারণ করবে ফিফার ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের দিকনির্দেশনা। যদি ইনফান্তিনো চতুর্থ মেয়াদের জন্য প্রার্থী হন, তাহলে এটি সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফিফা নির্বাচনগুলোর একটি হতে পারে। আর যদি বিরোধী পক্ষ প্রশাসনিক বয়কট কিংবা বিকল্প প্রতিযোগিতা আয়োজনের মতো পদক্ষেপ বাস্তবায়নের দিকে এগোয়, তাহলে বিশ্ব ফুটবল এমন এক সাংগঠনিক সংকটের মুখোমুখি হতে পারে, যার প্রভাব মাঠের খেলাকে ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রশাসনের ভবিষ্যতের ওপরও পড়বে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত