প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে অবশেষে নিজেদের ব্যাটিং সামর্থ্যের প্রমাণ দিল পাকিস্তান। পোর্ট অব স্পেনে দ্বিতীয় দিনের খেলায় বাবর আজম ও আব্দুল্লাহ শফিকের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে সফরকারীরা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর দুই ব্যাটারের দায়িত্বশীল ও নান্দনিক ব্যাটিং পাকিস্তানকে শুধু ম্যাচে ফিরিয়েই আনেনি, বরং দলটির সমর্থকদের মাঝেও ফিরিয়েছে স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাস।
দিন শেষে পাকিস্তানের স্কোর দাঁড়িয়েছে ২ উইকেটে ২৬৬ রান। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসের ৩৪৪ রানের জবাবে এখনো ৭৮ রানে পিছিয়ে থাকলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিজেদের অনুকূলে নিয়ে এসেছে পাকিস্তান। বিশেষ করে তৃতীয় উইকেটে বাবর আজম ও আব্দুল্লাহ শফিকের অবিচ্ছিন্ন ১৬৮ রানের জুটি ম্যাচের গতিপথ বদলে দিয়েছে।
বাবর ও আব্দুল্লাহর ব্যাটিং দেখে পাকিস্তানের এক সমর্থক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “দেখে মনে হচ্ছে ইজাজ আহমেদ ও ইনজামাম-উল-হক ব্যাট করছেন।” পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসে ইজাজ ও ইনজামামের জুটি ছিল মিডল অর্ডারের অন্যতম নির্ভরতার প্রতীক। তাই নতুন প্রজন্মের কোনো ব্যাটিং জুটি যখন দীর্ঘ সময় ধরে দাপট দেখায়, তখন সমর্থকদের মনে ফিরে আসে সেই সোনালি দিনের স্মৃতি।
চলতি সিরিজে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল ব্যাটিং। ত্রিনিদাদে অনুষ্ঠিত প্রথম টেস্টে ৯০ রানের হারের পেছনে অন্যতম কারণ ছিল ব্যাটারদের ব্যর্থতা। ধারাবাহিকভাবে উইকেট হারানো এবং বড় ইনিংস গড়তে না পারার কারণে চাপের মুখে ছিল পাকিস্তান দল। দ্বিতীয় টেস্টে তাই ব্যাটারদের কাছ থেকে বড় ইনিংসের প্রত্যাশা ছিল স্বাভাবিক।
সেই প্রত্যাশার জবাব দিয়েছেন আব্দুল্লাহ শফিক ও বাবর আজম। বিশেষ করে টেস্ট দলে ফিরে আব্দুল্লাহ যেভাবে নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়েছেন, তা পাকিস্তানের জন্য বড় স্বস্তির খবর। দিনের শেষ ভাগে তিনি তুলে নিয়েছেন ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ টেস্ট সেঞ্চুরি। ২০২৪ সালের পর টেস্ট ক্রিকেটে এটি তাঁর প্রথম শতক। দিন শেষে তিনি অপরাজিত আছেন ১০৭ রানে।
অন্যদিকে বাবর আজমও নিজের হারানো ছন্দ ফিরে পাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে টেস্ট ক্রিকেটে বড় ইনিংসের অপেক্ষায় থাকা এই তারকা ব্যাটার দিন শেষ করেছেন ৮৬ রানে অপরাজিত থেকে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৬১ রানের ইনিংসের পর টেস্টে এটিই তাঁর সর্বোচ্চ রানের ইনিংস।
এর আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম দিনের ৫ উইকেটে ২৩৯ রান নিয়ে দ্বিতীয় দিনের খেলা শুরু করেছিল। জাস্টিন গ্রিভস ও রোস্টন চেজের গুরুত্বপূর্ণ ফিফটির ওপর ভর করে স্বাগতিকরা আরও ১০৫ রান যোগ করে। শেষ পর্যন্ত ৩৪৪ রানে অলআউট হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে জাস্টিন গ্রিভস সর্বোচ্চ ৭৩ রান করেন। রোস্টন চেজ করেন ৭০ রান। এছাড়া ব্র্যান্ডন কিংয়ের ব্যাট থেকে আসে ৪৬ রান এবং শাই হোপ করেন ২৯ রান। পাকিস্তানের হয়ে বল হাতে সফল ছিলেন সাজিদ খান। তিনি নিয়েছেন ৪ উইকেট। উবাইদ শাহ, আব্রার আহমেদ ও উসমান খান পেয়েছেন দুটি করে উইকেট।
৩৪৫ রানের লক্ষ্য সামনে রেখে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুটা খুব একটা ভালো হয়নি পাকিস্তানের। দলীয় ৩৪ রানের মাথায় ওপেনার ইমাম-উল-হক ফিরে যান ১৪ রান করে। এরপর আব্দুল্লাহ শফিক ও আজান আওয়াইস দ্বিতীয় উইকেটে ৬৪ রানের জুটি গড়ে পরিস্থিতি সামাল দেন। আজান ৫৫ রান করে আউট হওয়ার পর উইকেটে আসেন বাবর আজম।
এরপরই দেখা যায় পাকিস্তানের দুই অভিজ্ঞ ব্যাটারের দৃঢ়তা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলাররা চেষ্টা করলেও তাঁরা কোনো সুযোগ দেননি। ধৈর্য, শট নির্বাচন এবং উইকেটের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতায় তাঁরা প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণকে কার্যত নিষ্প্রভ করে দেন।
বাবরের ইনিংসে ছিল ১০টি চার ও একটি ছক্কা। আব্দুল্লাহও খেলেছেন আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে। তাঁর ইনিংসে রয়েছে ১০টি চার ও দুটি ছক্কা। দুজনের ব্যাটিংয়ে ছিল আস্থা ও নিয়ন্ত্রণের দারুণ সমন্বয়।
পরিসংখ্যানেও এই জুটির গুরুত্ব স্পষ্ট। ২০০৬ সালে ওভাল টেস্টের পর এশিয়ার বাইরে তৃতীয় উইকেটে পাকিস্তানের এটি প্রথম দেড় শ রানের জুটি। ফলে শুধু ম্যাচ পরিস্থিতির দিক থেকেই নয়, ঐতিহাসিক দিক থেকেও এই জুটির গুরুত্ব রয়েছে।
পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো, দলের শীর্ষ ব্যাটাররা একই ইনিংসে নিজেদের মেলে ধরেছেন। বাবর আজম সাম্প্রতিক সময়ে সমালোচনার মুখে ছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর আগের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু এই ইনিংস আবারও দেখিয়েছে, তিনি ফর্মে ফিরলে পাকিস্তানের ব্যাটিং অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
আব্দুল্লাহ শফিকের ক্ষেত্রেও এই সেঞ্চুরি গুরুত্বপূর্ণ। দলে ফিরে এমন একটি ইনিংস খেলে তিনি নিজের জায়গা আরও শক্ত করেছেন। তরুণ এই ব্যাটারের ধৈর্যশীল ব্যাটিং পাকিস্তানের ভবিষ্যতের জন্যও ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
এখন ম্যাচের তৃতীয় দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। পাকিস্তান যদি দ্রুত ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ পেরিয়ে বড় লিড নিতে পারে, তাহলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তাদের হাতে চলে যেতে পারে। অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ চাইবে দ্রুত উইকেট তুলে নিয়ে পাকিস্তানের রান আটকাতে।
দুই দলের জন্যই সিরিজের শেষ টেস্টটি মর্যাদার লড়াই। প্রথম ম্যাচে জয় পাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ জয়ের আশা ধরে রাখতে চাইবে, আর পাকিস্তান চাইবে হার এড়িয়ে সমতা ফেরাতে। তবে দ্বিতীয় দিনের বাবর-আব্দুল্লাহর ব্যাটিং নিঃসন্দেহে পাকিস্তান শিবিরে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।