কেরানীগঞ্জে দলবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় ৬ জনের সাজা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার
কেরানীগঞ্জে দলবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় ৬ জনের সাজা

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর নিকটবর্তী জনবহুল এলাকা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা অঞ্চলে আজ থেকে প্রায় চার বছর আগে ঘটে যাওয়া এক পৈশাচিক, মর্মান্তিক ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে অত্যন্ত ঐতিহাসিক ও দৃষ্টান্তমূলক এক রায় ঘোষণা করা হয়েছে। জন্মদিনের আনন্দঘন একটি ছোট্ট আয়োজন শেষে রাতে বাড়ি ফেরার পথে দুই তরুণীকে অত্যন্ত নির্মমভাবে তুলে নিয়ে গিয়ে সংঘবদ্ধভাবে দলবদ্ধ ধর্ষণের অপরাধে অভিযুক্ত ছয় বখাটে যুবককে আমৃত্যু কারাদণ্ডের কঠোর সাজা প্রদান করেছেন আদালত। মঙ্গলবার সকালে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিজ্ঞ বিচারক মুন্সী মো. মশিয়ার রহমান এই বহুল প্রতীক্ষিত চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণা করেন, যা নারী ও শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দেশের বিচারব্যবস্থার দৃঢ় অবস্থানের একটি অনন্য ও জোরালো বার্তা হিসেবে সারা দেশে প্রশংসিত হয়েছে।

আদালত সূত্রে এবং মামলার এজাহার থেকে প্রাপ্ত বিস্তারিত বিবরণে জানা যায় যে, সুদূর অতীতের সেই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২২ সালের পঁচিশ জুন তারিখের এক সন্ধ্যায়। সেদিন ওই দুই তরুণীসহ তাদের সমবয়সী বেশ কতিপয় বন্ধু মিলে তাদেরই এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর জন্মদিন উদ্‌যাপন করার উদ্দেশ্যে আনন্দভ্রমণে বের হয়েছিল। সারাদিন নানা আনন্দ ও উল্লাসের মধ্য দিয়ে সময় কাটানোর পর সেদিন রাত পৌনে দশটার দিকে তারা সবাই মিলে কেরানীগঞ্জের সুপরিচিত পানকৌড়ি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার সম্পন্ন করেন। খাবার খাওয়া শেষে তারা যখন নিজ নিজ বাসায় ফিরে যাওয়ার জন্য দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা এলাকার একটি সড়কে দাঁড়িয়ে অটোরিকশা কিংবা কোনো যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই ওত পেতে থাকা একদল লম্পট ও বখাটে যুবক একটি অটোমিশুক নিয়ে আকস্মিক সেখানে এসে তাদের পথরোধ করে দাঁড়ায়।

এরপর ওই নরপিশাচরা বর্বরোচিত কায়দায় তরুণী ও তাদের বন্ধুদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে মারধর শুরু করে এবং একপর্যায়ে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে ওই দুই তরুণীকে পার্শ্ববর্তী রতনের খামার নামক একটি অন্ধকার ও জনশূন্য মাঠে ধরে নিয়ে যায়। অসহায় তরুণীদের সঙ্গে থাকা পুরুষ বন্ধুরা এই পাশবিকতার প্রতিবাদ করতে গেলে আসামিরা তাদের চরমভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এবং শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে তাদের জিম্মি করে ফেলে। শুধু তাই নয়, সন্ত্রাসীরা আতঙ্কিত বন্ধুদের পকেটে থাকা সমস্ত টাকা-পয়সা এবং যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত দামি মোবাইল ফোনগুলো জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়। এরপর চরম জিঘাংসা নিয়ে ওই দুই তরুণীর ওপর চালায় তাদের পূর্বপরিকল্পিত ও পৈশাচিক দলবদ্ধ ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ, যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

নরপিশাচরা শুধু তাদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তাদের এই ঘৃণ্য ও পৈশাচিক অপরাধের পুরো দৃশ্যটি তাদের নিজেদের মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করে রাখে, যাতে পরবর্তীতে এই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তরুণীদের আজীবন মুখ বন্ধ করে রাখা যায়। অপরাধ সংঘটিত করার পর যাওয়ার সময়ও তারা ভুক্তভোগী দুই তরুণীর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনগুলো জোরপূর্বক কেড়ে নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। কোনো রকমে জান নিয়ে সেখান থেকে মুক্ত হয়ে দুই তরুণীর আতঙ্কিত বন্ধুরা তাৎক্ষণিকভাবে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় উপস্থিত হয়ে পুরো ঘটনাটি পুলিশ প্রশাসনকে বিস্তারিতভাবে অবহিত করেন। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায় এবং স্থানীয়দের সহযোগিতায় চরম ট্রমার শিকার হওয়া ওই দুই তরুণীকে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসে।

এই ঘটনার পর ভুক্তভোগী এক তরুণীর বাবা বাদী হয়ে ওই বছরেরই ঊনত্রিশ জুন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধীদের গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে। র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‍্যাবের একটি চৌকস দল অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে অভিযান চালিয়ে মামলার অন্যতম প্রধান আসামি মিনহাজ আবেদীনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ভুক্তভোগী এক তরুণীর ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোনটি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই মোবাইল ফোনটি পরীক্ষা করতেই থলের বেড়াল বেরিয়ে আসে এবং তদন্তকারী দল ফোনটির মেমোরিতে দুই ভুক্তভোগী তরুণীর ওপর চালিত সেই পৈশাচিক দলবদ্ধ ধর্ষণের অকাট্য ভিডিও চিত্র খুঁজে পায়, যা মামলার গতিপথ ও প্রমাণ সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে শতভাগ নিশ্চিত করে।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শরজিৎ কুমার ঘোষ অত্যন্ত নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দীর্ঘ তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে এই মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে আদালতে ছয়জন অভিযুক্ত যুবকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণসহ বিস্তারিত অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল করেন। পরবর্তীতে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচারকার্য আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালীন বিজ্ঞ আদালত অত্যন্ত সংবেদনশীল এই মামলার পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার স্বার্থে মোট বারো জন বিজ্ঞ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করেন। আদালতের বিচারিক কার্যক্রমে আসামিদের পক্ষে তাদের আইনজীবীরা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেলেও রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের পেশ করা অকাট্য তথ্য-উপাত্ত, উদ্ধারকৃত ভিডিও এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্যের সামনে তাদের সমস্ত যুক্তি ধোপে টেকেনি। উভয় পক্ষের দীর্ঘ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন এবং আইনি বিশ্লেষণ শেষে অবশেষে মঙ্গলবার বিজ্ঞ আদালত অভিযুক্ত ছয় আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে এই যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন।

এই চাঞ্চল্যকর মামলায় বিজ্ঞ আদালত যাদের আমৃত্যু কারাদণ্ডের কঠোর সাজা প্রদান করেছেন, সেই দণ্ডপ্রাপ্ত ছয় অপরাধী হলো রাহুল, ডায়মন্ড, আফসার উদ্দিন অনিম, পারভেজ হক পলাশ, মিনহাজ ওরফে মিনহাজ আবেদীন এবং মিনহাজ ওরফে বাবু ওরফে মিনহাজ বাবু। রাষ্ট্রপক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবী এরশাদ আলম জর্জ গণমাধ্যমকে রায়ের বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করে জানান যে, আদালত আসামিদের কেবল আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে দণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেক আসামিকে আলাদাভাবে এক লক্ষ টাকা করে অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত করেছেন। রায়ে আরও অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, এই দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের নিজ নিজ নামে থাকা যেকোনো ধরনের স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি আইনানুগ প্রক্রিয়ায় বাজোপ্ত ও বিক্রি করে সেই অর্থদণ্ডের টাকা আদায় করতে হবে। সংগৃহীত সেই অর্থ পরবর্তীতে ভুক্তভোগী দুই নির্যাতিত তরুণী বা তাদের শোকার্ত পরিবারের হাতে ক্ষতিপূরণ হিসেবে তুলে দেওয়ার জন্য ঢাকার সম্মানিত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা কালেক্টরকে বিজ্ঞ আদালত সুনির্দিষ্ট নির্দেশ প্রদান করেছেন।

এদিকে বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালীন ও রায় ঘোষণার সময় আসামিদের উপস্থিতির বিষয়ে জানা যায় যে, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে রাহুল নামের ওই লম্পট যুবক দীর্ঘদিন ধরে পলাতক রয়েছে এবং বিচারের পুরো সময় জুগেই সে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে ছিল। পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে আদালত অবিলম্বে যথাযথ সাজা পরোয়ানাসহ আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন, যেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত তাকে আইনের আওতায় আনতে পারে। অন্যদিকে, রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত থাকা অপর পাঁচ আসামিকে রায়ের পরপরই কঠোর পুলিশি প্রহরায় সাজা পরোয়ানা জারি করে সরাসরি কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সমাজ সচেতন মহল ও মানবাধিকার কর্মীরা আদালতের এই কঠোর রায়কে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছেন যে, এ ধরনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে সমাজে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা কখনোই সম্ভব হতো না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত