প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফুটবলের মাঠে সবচেয়ে নিঃসঙ্গ অবস্থানে থাকা খেলোয়াড়টির নাম গোলকিপার। ৯০ মিনিটের খেলায় তাঁকে অনেক সময় দর্শকের চোখ এড়িয়ে থাকতে হয়। কিন্তু একটি ভুল মুহূর্তেই তিনি হয়ে উঠতে পারেন পরাজয়ের প্রধান কারণ। আবার অসাধারণ এক সেভ তাঁকে এনে দিতে পারে দলের নায়কের মর্যাদা। তবুও দলবদলের বাজারে গোলরক্ষকদের মূল্যায়ন এখনো অন্য পজিশনের খেলোয়াড়দের তুলনায় অনেক কম।
আধুনিক ফুটবলে গোলকিপারের গুরুত্ব নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। একটি শক্তিশালী রক্ষণভাগের পাশাপাশি একজন নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক বড় সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু অর্থের হিসাবে সেই গুরুত্ব সবসময় প্রতিফলিত হয় না। ফরোয়ার্ড, উইঙ্গার কিংবা আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডারদের পেছনে যেখানে ক্লাবগুলো শত কোটি ইউরো খরচ করতে প্রস্তুত, সেখানে গোলরক্ষকদের জন্য ব্যয় অনেক সীমিত।
এই বৈষম্যের সর্বশেষ উদাহরণ ইংল্যান্ডের তরুণ গোলরক্ষক জেমস ট্রাফোর্ড। ম্যানচেস্টার সিটি থেকে তাঁর লিডস ইউনাইটেডে যোগ দেওয়ার সম্ভাব্য দলবদল ফি প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ ইউরো। যদি চুক্তিটি সম্পন্ন হয়, তবে লিডসের ইতিহাসে সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় হিসেবে একজন গোলরক্ষকের নাম লেখা হবে। প্রিমিয়ার লিগের মতো প্রতিযোগিতামূলক লিগে এটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।
অথচ একই সময়ে দেখা যায়, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড়দের তালিকায় গোলরক্ষকদের অবস্থান অনেক নিচে। ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল গোলরক্ষক এখনো কেপা আরিসাবালাগা। ২০১৮ সালে অ্যাথলেটিক বিলবাও থেকে তাঁকে দলে নিতে চেলসি খরচ করেছিল ৮ কোটি ইউরো। একই বছরে লিভারপুল রোমা থেকে আলিসন বেকারকে কিনেছিল ৭ কোটি ২৫ লাখ ইউরোতে। এর আগে ২০০১ সালে জুভেন্টাস পার্মা থেকে জিয়ানলুইজি বুফনকে দলে নিতে ব্যয় করেছিল প্রায় ৫ কোটি ইউরো।
অবাক করার মতো বিষয় হলো, গোলরক্ষকদের মধ্যে ৫ কোটি ইউরো ছাড়ানো দলবদলের সংখ্যা হাতে গোনা। অথচ অন্য পজিশনে এই অঙ্ক এখন প্রায় নিয়মিত। গ্যারেথ বেল, পল পগবা কিংবা নেইমারের মতো আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়দের দলবদলে ১০ কোটি ইউরোর বেশি খরচ হয়েছে। এমনকি ডিফেন্ডারদের ক্ষেত্রেও বড় বিনিয়োগ এখন স্বাভাবিক ঘটনা। ২০১৯ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড হ্যারি ম্যাগুয়ারকে দলে নিতে প্রায় ৮ কোটি ৭০ লাখ ইউরো খরচ করেছিল।
প্রশ্ন হলো, গোলরক্ষকদের বাজার এত পিছিয়ে কেন?
এর অন্যতম কারণ হলো ফুটবলের জনপ্রিয়তা ও মূল্যায়নের ধরন। আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের অবদান সহজে পরিমাপ করা যায়। একটি গোল, একটি অ্যাসিস্ট বা একটি ম্যাচ জেতানো মুহূর্ত সরাসরি চোখে পড়ে। ফলে একজন স্ট্রাইকার বা উইঙ্গারের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করার যৌক্তিকতা ক্লাব কর্তাদের কাছে সহজে তুলে ধরা যায়।
অন্যদিকে গোলরক্ষকের সাফল্য অনেক সময় অদৃশ্য। তিনি হয়তো ৮৫ মিনিট নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকেন, কিন্তু শেষ পাঁচ মিনিটে একটি অসাধারণ সেভ করে দলকে জিতিয়ে দিতে পারেন। আবার একটি ভুল সিদ্ধান্ত পুরো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। এই দ্বৈত চরিত্রই গোলরক্ষকদের মূল্য নির্ধারণকে কঠিন করে তুলেছে।
১৯৭৭ সালের একটি ঘটনা এই মানসিকতার উদাহরণ হিসেবে প্রায়ই আলোচিত হয়। নটিংহাম ফরেস্টের কোচ ব্রায়ান ক্লফ যখন গোলরক্ষক পিটার শিলটনের জন্য ২ লাখ ৭০ হাজার পাউন্ড খরচ করতে চেয়েছিলেন, তখন ক্লাবের ভেতর থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল—যে খেলোয়াড় ম্যাচের বড় সময় তেমন কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা রাখেন না, তাঁর জন্য এত অর্থ কেন?
যদিও সময়ের সঙ্গে ফুটবল বদলেছে। এখন গোলরক্ষক শুধু শট ঠেকানোর খেলোয়াড় নন। আধুনিক ফুটবলে তাঁকে বল নিয়ন্ত্রণ, পাসিং, আক্রমণ শুরু করা এবং রক্ষণভাগ পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করতে হয়। ম্যানচেস্টার সিটির এদেরসন, লিভারপুলের আলিসন বা বায়ার্ন মিউনিখের ম্যানুয়েল নয়্যার দেখিয়েছেন, একজন গোলরক্ষক কীভাবে দলের কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারেন।
তবুও গোলরক্ষকদের মূল্যায়নে সমস্যা রয়ে গেছে। এর বড় কারণ তথ্য বিশ্লেষণের সীমাবদ্ধতা। লিভারপুলের সাবেক গবেষণা পরিচালক ইয়ান গ্রাহামের মতে, গোলরক্ষকদের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করা এখনো কঠিন। কতটি শট ঠেকালেন, তা পরিসংখ্যানে ধরা যায়। কিন্তু কখন গোললাইন ছেড়ে বের হওয়া উচিত ছিল, কোন কর্নারে সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল, কিংবা পজিশনিং কতটা কার্যকর ছিল—এসব বিশ্লেষণের জন্য আরও উন্নত তথ্য প্রয়োজন।
এই সীমাবদ্ধতা দলবদলের বাজারেও প্রভাব ফেলে। অনেক ক্লাব গোলরক্ষক নির্বাচনে পর্যাপ্ত গবেষণা করতে পারে না। ফলে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তারা ঝুঁকি নিতে চায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গোলরক্ষকদের বাজারের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো স্থায়িত্ব। একজন ভালো গোলরক্ষক দলে এলে সাধারণত অনেক বছর ধরে খেলতে পারেন। একজন ফরোয়ার্ড বা মিডফিল্ডারের ক্ষেত্রে প্রতি মৌসুমে নতুন প্রতিযোগিতা ও পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু একজন নির্ভরযোগ্য এক নম্বর গোলরক্ষক পাঁচ থেকে আট বছর পর্যন্ত একই জায়গা ধরে রাখতে পারেন। ফলে ক্লাবগুলোর নিয়মিত বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন কম হয়।
চাহিদা ও সরবরাহের বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বমানের গোলরক্ষকের সংখ্যা খুব বেশি নয়। যারা আছেন, তাঁদের অধিকাংশই ইতিমধ্যে বড় ক্লাবে প্রতিষ্ঠিত। তাই বাজারে তাঁদের উপস্থিতি সীমিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শীর্ষ পর্যায়ের গোলরক্ষকদের বড় দলবদলের সংখ্যাও খুব বেশি নয়।
তবে ফুটবলের কৌশল যত পরিবর্তিত হচ্ছে, গোলরক্ষকদের গুরুত্ব তত বাড়ছে। এখন একজন গোলরক্ষক শুধু শেষ প্রহরী নন, তিনি দলের প্রথম আক্রমণকারীও। প্রতিপক্ষের প্রেসিং ভাঙা, দ্রুত আক্রমণ শুরু করা এবং রক্ষণ সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
তারপরও অর্থের হিসাবে গোলরক্ষকদের অবস্থান এখনো প্রশ্নের মুখে। তাঁরা দলের সাফল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বাজারে তাঁদের প্রকৃত মূল্য কত—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়। হয়তো ভবিষ্যতের ফুটবলে আরও উন্নত বিশ্লেষণ ও নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি এই ব্যবধান কমিয়ে আনবে। ততদিন পর্যন্ত গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মূল্য হয়তো মাঠের গুরুত্বের তুলনায় বাজারে কমই থাকবে।