প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল উৎসব ঘিরে সৃষ্ট তীব্র বিতর্ক, সমালোচনা এবং মাঠের বাইরের নানামুখী ঘটনাপ্রবাহের জেরে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে এক অভাবনীয় বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়েছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমালোচনার কড়া জবাব দিলেও তার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় তাঁকে বিশ্ব ফুটবল পরিচালনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অযোগ্য আখ্যা দিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা ফেয়ারস্কোয়ার। ১৯ জুলাই সমাপ্ত হওয়া এবারের বিশ্বকাপ যেমন মাঠের নৈপুণ্যে আনন্দ ছড়িয়েছিল, তেমনি মাঠের বাইরের নানা বিতর্ক, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে বারবার খবরের শিরোনাম হয়েছিল। বিশেষ করে টিকিটমূল্য বৃদ্ধি, মার্কিন প্রশাসনের রাজনৈতিক তদবির এবং কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে নিয়ম শিথিল করার ঘটনাগুলো ফুটবলপ্রেমী ও বিশ্লেষকদের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর সমালোচকদের তীব্র তোপের মুখে পড়ে ৫৬ বছর বয়সি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো একটি দীর্ঘ খোলাচিঠি প্রকাশ করেন। ১৫ পাতার ওই বার্তায় তিনি তাঁর ওপর আসা সমস্ত সমালোচনার অত্যন্ত কড়া ভাষায় জবাব দেন। ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে যারা নিয়মিত ঘৃণা করেন বা সমালোচনা করেন, তাদের উদ্দেশ্যে এক প্রকার বিরক্তি প্রকাশ করে তিনি বলেন যে সমালোচকদের উচিত ধ্যানের আশ্রয় নেওয়া, প্রার্থনা করা কিংবা নিছক ফুটবল ম্যাচ উপভোগ করা। ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত ওই দীর্ঘ চিঠিতে ইনফান্তিনো আরও দাবি করেন যে, সমালোচকেরা ফুটবল উৎসবের মূল আনন্দ এবং সম্প্রীতির বার্তা পুরোপুরি এড়িয়ে গেছেন এবং এর পরিবর্তে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নানা ধরনের মিথ্যা গুজব ও ঘৃণা ছড়িয়েছেন। তাঁর মতে, টুর্নামেন্টের বিশাল কর্মযজ্ঞের মাঝে এই ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা ফুটবলের মূল আত্মাকে আঘাত করেছে।
তবে ইনফান্তিনোর এই আক্রমণাত্মক এবং হিসাব চুকানোর বার্তা মুহূর্তেই হিতে বিপরীত ফল বয়ে আনে। ফিফা সভাপতির এই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই মানবাধিকার সংস্থাগুলো এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটিতে ফিফার বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ দাখিলকারী মানবাধিকার সংস্থা ফেয়ারস্কোয়ার ইনফান্তিনোর বিবৃতির কঠোর সমালোচনা করে একটি পাল্টা বিবৃতি দেয়। সংস্থাটির পরিচালক ও সহপ্রতিষ্ঠাতা নিকোলাস ম্যাকগিহান সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন যে, ইনফান্তিনোর এই বক্তব্য স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে নিজের অজনপ্রিয়তা সম্পর্কে তাঁর নূন্যতম কোনো ধারণাই নেই। তিনি আরও যোগ করেন যে ফিফা সভাপতি বর্তমানে সংস্থার ভেতরে তোষামোদকারী এবং অনুগতদের একটি চক্র দ্বারা সম্পূর্ণ পরিবেষ্টিত রয়েছেন, যার ফলে বহির্বিশ্বে তাঁর নিজের যে ব্যাপক অজনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে, সেই বাস্তব পরিস্থিতি থেকে তিনি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। এই ধরনের বিচ্ছিন্ন ও আক্রমণাত্মক মানসিকতা বিশ্ব ফুটবল পরিচালনার জন্য তাঁকে সম্পূর্ণভাবে অযোগ্য করে তুলেছে বলে দাবি করে ফেয়ারস্কোয়ার।
এবারের বিশ্বকাপ জুড়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফিফা সভাপতির ঘনিষ্ঠতা ও যোগাযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচুর আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। এই সম্পর্কের পরিধি এবং এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই তদন্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে ফিফাকে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের বিচার বিভাগীয় কমিটির সামনে সশরীরে হাজির হওয়ার জন্য ইনফান্তিনোকে একটি লিখিত সাক্ষাৎকার ও জবাব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাট এক আইনপ্রণেতা। কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ও কংগ্রেস সদস্য জেমি রাসকিন ফিফা কর্তৃপক্ষের কাছে ট্রাম্প, তাঁর প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং ট্রাম্পের পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে ফিফার সব ধরনের যোগাযোগ এবং লেনদেনের সমস্ত দাপ্তরিক নথি অবিলম্বে সরবরাহ করার কড়া অনুরোধ জানিয়েছেন। বিগত বছরগুলোতে ফিফা কতৃক ট্রাম্প টাওয়ারে কার্যালয় ভাড়া নেওয়ার বিষয়টিও এখন জোরালোভাবে সামনে চলে এসেছে। দ্য অ্যাথলেটিকের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাসকিন ইনফান্তিনোর কাছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, তাঁর প্রশাসনের কোনো সদস্য কিংবা ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো সংস্থাকে দেওয়া যেকোনো ধরনের মূল্যবান উপহার, আর্থিক লেনদেন, পুরস্কার কিংবা জনসমক্ষে একসঙ্গে উপস্থিতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা দাবি করেছেন।
মাঠের খেলা চলাকালীন সময়েও ফিফাকে বেশ কয়েকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশের সমর্থক, খেলোয়াড় এবং কর্মকর্তাদের ওপর মার্কিন প্রশাসনের কড়া ভিসা বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছিল। তবে সবকিছুকে ছাড়িয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল মার্কিন ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের শাস্তির ঘটনাটি। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে একটি ম্যাচে লাল কার্ড পাওয়ার পর নিয়মানুযায়ী বালোগানের ওপর এক ম্যাচের স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞা আসার কথা ছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপে ফিফা আকস্মিকভাবে সেই শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত স্থগিত করে দেয়, যা ফুটবলপ্রেমী ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষকদের মনে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এছাড়া আর্জেন্টিনা ও মিসরের মধ্যকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং তার পরবর্তী ব্যবস্থাপনাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মূলধারার সংবাদমাধ্যমে চরম সমালোচনার ঝড় তুলেছিল। সব মিলিয়ে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ পদে থেকে ইনফান্তিনোর এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং সমালোচকদের প্রতি অসহিষ্ণু আচরণ আগামী দিনে ফিফার প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতাকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।