খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে গবেষণা-উদ্ভাবনের ওপর নোবিপ্রবিতে সেমিনার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে গবেষণা-উদ্ভাবনের ওপর নোবিপ্রবিতে সেমিনার

প্রকাশ: ২৯ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বব্যাপী বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রধান এবং উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন এবং তার ফলে সৃষ্টি হওয়া খাদ্য নিরাপত্তা সংকট অন্যতম প্রধান একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ অঞ্চলে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব অত্যন্ত প্রকট আকার ধারণ করেছে, যা কৃষিপণ্য উৎপাদন এবং সামগ্রিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই মহাসংকট উত্তরণে দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও নদীমাতৃক অববাহিকাগুলোর পরিবেশগত বাস্তবতা অনুধাবন করে সুনির্দিষ্ট গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে দেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম বিদপীঠ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বা নোবিপ্রবিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। মেঘনা অববাহিকার ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আয়োজিত এই সেমিনারে দেশের খ্যাতনামা গবেষক, শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকরা অংশ নিয়ে বহুমুখী দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন।

সম্প্রতি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল বা আইকিউএসি-এর আধুনিক সম্মেলনকক্ষে ‘মেঘনা অববাহিকায় ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে জলবায়ুসহিষ্ণু কৃষি, গবেষণা ও উদ্ভাবন’ শীর্ষক এই সেমিনারটি অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের আর্থিক সহায়তায় এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের উদ্যোগে আয়োজিত এই সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। দিনব্যাপী চলা এই সেমিনারে মূল আলোচ্য বিষয় ছিল জলবায়ুর পরিবর্তনশীল প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে কীভাবে কৃষি ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা যায় এবং মেঘনা অববাহিকা অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তা চিরতরে সুরক্ষিত করা যায়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন যে, বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমুখী প্রভাব মোকাবিলা করে দেশের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমাদের দেশ একটি নদীমাতৃক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকা হওয়ায় এখানে প্রায়শই তীব্র ঝড়, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘমেয়াদী খরা এবং নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষিজমি ও উৎপাদনে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনে, যার নেতিবাচক প্রভাব উপকূলীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। এই প্রতিকূল ও পরিবর্তনশীল পরিবেশ সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তা টেকসই করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে আমাদের এখনই বিজ্ঞানসম্মত ও জলবায়ুসহিষ্ণু ফসল নির্বাচন এবং গবেষণার ওপর জোর দিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

উক্ত সেমিনারে সভার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নোবিপ্রবি পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সম্মানিত চেয়ারম্যান এবং ‘জলবায়ুসহিষ্ণু ফসল নির্বাচন’ শীর্ষক প্রকল্পের সুযোগ্য প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মহিনুজ্জামান। তিনি তাঁর সভাপতির ভাষণে এই প্রকল্পের সার্বিক পটভূমি এবং মেঘনা অববাহিকা অঞ্চলের মানুষের জীবনজীবিকার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে মঞ্চে উপস্থিত থেকে মূল্যবান বক্তব্য প্রদান করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. হাছান উদ্দীন। তাঁরা উভয়েই বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা এবং যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ জোর দেন এবং এ ধরনের আয়োজনের জন্য আয়োজকদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন বা মুখ্য আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ ও গবেষক খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের স্বনামধন্য অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক। তাঁরা উভয়েই বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত ও গবেষণার নানা দিক তুলে ধরে মেঘনা অববাহিকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। আবহাওয়া ও পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষির নিবিড় সম্পর্ক এবং কীভাবে আগাম সতর্কবার্তা ও অভিযোজন কৌশলের মাধ্যমে কৃষকদের সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব, সে বিষয়ে তাঁরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সুপারিশমালা তুলে ধরেন যা উপস্থিত সকলের বিশেষভাবে নজর কাড়ে।

এছাড়াও সেমিনারে সম্মানিত আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক কনভেনশনের সুযোগ্য পরিচালক মির্জা শওকত আলী, নোবিপ্রবি এগ্রিকালচার বিভাগের সম্মানিত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. গাজী মো. মহসিন এবং নোয়াখালী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোসাম্মৎ শওকত আরা কলি। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন যে, উপকূলীয় ও অববাহিকা অঞ্চলের মাটি ও পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রচলিত চাষাবাদ পদ্ধতি এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো লবসহিষ্ণু ও খরাসহিষ্ণু নতুন জাতের শস্য উদ্ভাবন করা এবং মাঠপর্যায়ে তা দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া। সেমিনারের একপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বিস্তারিত সারসংক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মহিনুজ্জামান।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের উদার আর্থিক সহযোগিতায় আয়োজিত এই সেমিনারটি দেশের সামগ্রিক কৃষির ভবিষ্যৎ রূপরেখা তৈরিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থী এবং গবেষকরা এই সেমিনারের মাধ্যমে জলবায়ু অভিযোজন ও কৃষি গবেষণার বাস্তব ক্ষেত্র সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করার সুযোগ পেয়েছেন। দিনব্যাপী এই আয়োজনের সমাপনী পর্বে অংশগ্রহণকারী গবেষক ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন আমন্ত্রিত অতিথিরা, যা সমগ্র অনুষ্ঠানটিকে আরও বেশি প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয় করে তোলে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত জয় করে একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত এবং খাদ্যনিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এই সেমিনারটি এক অনন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত