আইনগত বাধা কাটল: এমপি হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন সরোয়ার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬
  • ২ বার
আইনগত বাধা কাটল: এমপি হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন সরোয়ার

প্রকাশ: ২৯ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক অঙ্গনে গত কয়েক মাস ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিরোধের অবশেষে একটি আইনি নিষ্পত্তি ঘটেছে। চট্টগ্রাম-২ আসন থেকে বিএনপির টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হওয়া প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতার বৈধতা এবং তাঁর সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার অবসান ঘটেছে। তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর পক্ষ থেকে করা স্থগিতাদেশের আবেদনটি কার্যতালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। দেশের প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের একটি হেভিওয়েট আপিল বেঞ্চ আজ বুধবার এই যুগান্তকারী আদেশ প্রদান করেন, যার ফলে সরোয়ার আলমগীরের সংসদ সদস্য পদ এবং জাতীয় সংসদের কার্যক্রমে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিয়ে আর কোনো আইনি বাধা রইল না।

আদালতের এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আদেশের পর বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে রায়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে জানান যে, হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় ইতিমধ্যে যথাযথভাবে প্রকাশিত ও সংরক্ষিত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মামলার মেরিট অনুযায়ী সিএমপি বা স্থগিতাদেশ চেয়ে করা আবেদনটির কার্যকারিতা আর থাকে না। মাননীয় আদালত আবেদনটি কার্যতালিকা থেকে সরাসরি বাদ দিয়েছেন এবং যেহেতু আদালতের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বিপরীত বা প্রতিকূল আদেশ দেওয়া হয়নি, তাই সরোয়ার আলমগীরের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে এবং তাঁর সংসদীয় এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ সংসদীয় অধিবেশনে অংশ নিতে আইনগতভাবে আর কোনো বাধা নেই।

অন্যদিকে, পরাজিত পক্ষের আইনি অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিনের অন্যতম আইনজীবী আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী জানান যে, তারা হাইকোর্টের রায়ের প্রত্যয়িত অনুলিপির জন্য ইতিমধ্যে নিয়মমাফিক আবেদন করেছেন। পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা আইনানুগ প্রক্রিয়ায় নিয়মিত লিভ টু আপিল বা আপিল করার অনুমতি চেয়ে উচ্চ আদালতে আবেদন দায়ের করবেন। অর্থাৎ আইনি লড়াইয়ের দরজা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও বর্তমান মুহূর্তে আপিল বিভাগের এই আদেশের ফলে সরোয়ার আলমগীরের সংসদ সদস্য পদ বহাল রয়েছে এবং তিনি তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব স্বাভাবিক নিয়মেই পালন করে যেতে পারবেন বলে আইনি বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সরোয়ার আলমগীর অংশ নেন, কিন্তু নির্বাচনের ঠিক আগে আগে নানা জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাঁকে। নির্বাচন কমিশনে যাচাই-বাছাইয়ের সময় ঋণখেলাপির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছিল। ইসি সচিবালয়ের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নিজের প্রার্থিতা ফিরে পেতে তিনি উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হন এবং হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করেন। প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করে তাঁকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি জনপ্রিয় ‘ধানের শীষ’ প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ প্রদান করেছিলেন।

নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর গত ৯ জুলাই এই রিটের চূড়ান্ত শুনানি ও দীর্ঘ আইনি পর্যালোচনা শেষে হাইকোর্ট রুল অ্যাবসলিউট বা যথাযথ ঘোষণা করে ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। ওই রায়ে সরোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বাতিলের নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তটিকে সম্পূর্ণ অবৈধ ও বেআইনি বলে ঘোষণা করা হয়। হাইকোর্টের এই রায়ের পরপরই নির্বাচন কমিশন সচিবালয় দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে চট্টগ্রাম-২ আসনে সরোয়ার আলমগীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে। একই দিন সন্ধ্যায় সংসদ ভবনে গিয়ে তিনি যথাযথভাবে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে সংসদীয় কার্যক্রমেও অংশ নিতে শুরু করেন।

তবে এই পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন আইনি লড়াই চালিয়ে যান। হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করা এবং জাতীয় সংসদের কোনো কার্যক্রমে বা অধিবেশনে সরোয়ার আলমগীরকে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখার সুনির্দিষ্ট আরজি জানিয়ে তিনি আপিল বিভাগে একটি আবেদন দাখিল করেছিলেন। চেম্বার আদালত ঘুরে মামলাটি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য নির্ধারিত হয়। বিগত দিনগুলোতে এই আবেদনের ওপর উভয় পক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ যুক্তি উপস্থাপন ও শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গত সোমবার এই বিষয়ে শুনানি শেষ হলে আদালত আজকের দিনের জন্য আদেশের সময় নির্ধারণ করেছিলেন এবং সে অনুযায়ী আজ বুধবার আপিল বিভাগ আবেদনটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চূড়ান্ত আদেশ দেন।

আদালতের এই শুনানিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনা করেন দেশের প্রখ্যাত জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির ও আইনজীবী আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী। অন্যদিকে সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীরের পক্ষে আইনি যুক্তি তুলে ধরেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম ও এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। এ সময় আদালতের কার্যক্রমে রাষ্ট্রপক্ষের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলও উপস্থিত ছিলেন। উভয় পক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ ও চুলচেরা আইনি যুক্তিতর্ক শোনার পর আপিল বিভাগ এই সিদ্ধান্ত দেন, যা রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।

নথিপত্র ও আদালতের পূর্ববর্তী ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই এই আসনে দুই প্রার্থীর আইনি লড়াই তুঙ্গে ছিল। গত ২ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তা প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে সরোয়ারের মনোনয়নপত্র বৈধ বলে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নুরুল আমিন ঋণখেলাপির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন। সেই আপিল মঞ্জুর করে গত ১৮ জানুয়ারি ইসি রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত বাতিল করে এবং সরোয়ারের প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়। এরপর আইনি লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের বিভিন্ন আদেশের মধ্য দিয়ে মামলাটি আজকের এই পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে।

সব মিলিয়ে, আপিল বিভাগের এই আদেশের ফলে দীর্ঘ আইনি কুয়াশা ভেদ করে চট্টগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে সরোয়ার আলমগীরের বৈধতা আপাতত সম্পূর্ণ সুরক্ষিত হলো। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও আইনি অনিশ্চয়তার যে মেঘ তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ঘিরে জমেছিল, তা অনেকটাই কেটে গেছে। এখন তিনি জনগণের রায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় সংসদে নিজের দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করতে পারবেন। তবে পরাজিত পক্ষের লিভ টু আপিল করার ঘোষণা দেওয়ায় এই আইনি লড়াইয়ের চূড়ান্ত অধ্যায় দেখতে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনি বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত