ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভনে কিশোরীকে ধর্ষণচেষ্টা, কাঠগড়ায় ইউপি সদস্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার
ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভনে কিশোরীকে ধর্ষণচেষ্টা, কাঠগড়ায় ইউপি সদস্য

প্রকাশ:  ২৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গ্রামীণ সমাজে জনপ্রতিনিধিদের নৈতিক দায়িত্ব ও সামাজিক অবস্থান যখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন তা সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ ও আস্থার সংকটের জন্ম দেয়। ক্ষমতার অপব্যবহার এবং লোলুপ দৃষ্টির শিকার হয়ে অবুঝ ও অসহায় কিশোরীদের ওপর নির্যাতন চালানোর মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা সমাজকে বারবার লজ্জার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার একটি অজপাড়াগাঁয়ে ফ্যামিলি কার্ড পাইয়ে দেওয়ার কুহকী লোভ দেখিয়ে এক পনেরো বছর বয়সী কিশোরীকে অত্যন্ত সুকৌশলে ঘরে ঢুকে ধর্ষণের চেষ্টার এক পৈশাচিক ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। এই গর্হিত অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত এক ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে থানায় সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করা হয়েছে, যা এলাকজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে।

ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণে জানা যায় যে, গত সোমবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ৭ নম্বর চিলারং ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের চিলারং গ্রামে এই লজ্জাজনক ঘটনাটি সংঘটিত হয়। অভিযুক্ত মো. আলাউদ্দীন নামের ওই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হয়ে সাধারণ মানুষের সেবা করার পরিবর্তে তিনি যেভাবে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি কিশোরীর সম্ভ্রমহানির চেষ্টা চালিয়েছেন, তা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী ওই কিশোরীর অসহায় বাবা বাদী হয়ে ঘটনার পরদিন মঙ্গলবার ঠাকুরগাঁও সদর থানায় উপস্থিত হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন।

মামলার এজাহার সূত্রে এবং স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবারটি অত্যন্ত দরিদ্র এবং তার বাবা পেশায় একজন খেটে খাওয়া দিনমজুর। ঘটনার দিন সোমবার সকালে তার বাবা তাদেরই এক অসুস্থ বড় মেয়েকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সুদূর দিনাজপুরে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যান। অপরদিকে পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিরা বাড়ির বাইরে থাকায় ঘরের অন্য কাজকর্মের সুবাদে তার মাও সকালে জীবিকার তাগিদে বাইরে চলে যান। বাড়িতে কেউ না থাকার সুবাদে পনেরো বছর বয়সী ওই কিশোরী একা অবস্থান করছিল। এই ফাঁকা সুযোগটিই অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করেন অভিযুক্ত ইউপি সদস্য আলাউদ্দীন, যিনি আগে থেকেই ওই পরিবারের অসহায় অবস্থার সুযোগ নেওয়ার ফন্দি আঁটছিলেন।

পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী গত সোমবার দুপুর আনুমানিক দেড়টার দিকে ইউপি সদস্য আলাউদ্দীন ওই কিশোরীর বাড়িতে এসে উপস্থিত হন এবং তাকে নানাভাবে আশ্বস্ত করে জানান যে সরকারিভাবে একটি ফ্যামিলি কার্ড তৈরি করে দেওয়া হবে। এই কার্ড পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তিনি ওই কিশোরীর কাছে তার জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি কার্ডের ফটোকপি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য দাবি করেন। সরল বিশ্বাসে কিশোরীটি তার এনআইডি কার্ডের ফটোকপি এনে দিলে লম্পট ইউপি সদস্য কৌশলে পরিবারের বাকি সদস্যরা কোথায় আছে এবং বাড়িতে আর কেউ আছে কি না, সে বিষয়ে বিভিন্ন খোঁজখবর নিতে শুরু করেন। বাড়িতে কেউ না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি চরম হীন মানসিকতার পরিচয় দিয়ে জোরপূর্বক ঘরে প্রবেশ করেন এবং ওই কিশোরীর গায়ে হাত দিয়ে তাকে ধর্ষণের পাশবিক চেষ্টা চালান।

হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই অতর্কিত আক্রমণে কিশোরীটি হতবাক হয়ে গেলেও চরম সাহসিকতার সঙ্গে নিজের আত্মরক্ষার চেষ্টা চালায়। লম্পটের কবল থেকে বাঁচতে সে কোনোমতে খাটের নিচে গিয়ে লুকিয়ে পড়ার চেষ্টা করে এবং সুযোগ বুঝে ঘর থেকে কোনোমতে বের হয়ে জোরে ডাক-চিৎকার শুরু করে। তার আর্তচিৎকার ও কান্নার আওয়াজ শুনে আশপাশের বাড়িঘর থেকে কিছু সাহসী স্থানীয় বাসিন্দা দ্রুত দৌড়ে ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে আসেন। সাধারণ মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে এবং গণরোষের আশঙ্কায় লম্পট ইউপি সদস্য আলাউদ্দীন অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ঘটনাস্থল থেকে কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। স্থানীয়রা দ্রুত সেখানে পৌঁছে কিশোরীকে উদ্ধার করেন এবং তার মাধ্যমে পুরো বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পেরে চরম ক্ষোভে ফেটে পড়েন।

এদিকে দিনাজপুর থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাড়িতে ফিরে আসার পর বাবা দেখতে পান যে তাঁর কিশোরী মেয়ের গলায় বেশ কিছু স্পষ্ট আঁচড়ের দাগ রয়েছে এবং সে মানসিকভাবে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত ও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। মেয়ের মুখে সব ঘটনা শুনে এবং তার শারীরিক অবস্থা অবলোকন করে তিনি আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত তাকে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল ঠাকুরগাঁওয়ে নিয়ে যান এবং সেখানে তাকে জরুরি ভিত্তিতে ভর্তি করান। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই কিশোরী শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক ট্রমার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। ঘটনার পরপরই এলাকার কিছু প্রভাবশালী ও গণ্যমান্য ব্যক্তি বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার বা স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করার অপচেষ্টা চালালে অভিযুক্ত ইউপি সদস্য আলাউদ্দীন উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারকে নানা ধরনের ভয়ভীতি ও দেখে নেওয়ার হুমকি দেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, একজন জনপ্রতিনিধির মুখে এ ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও হুমকির ভাষা শোনার পর এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের আগুন আরও বেশি দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে আইনের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া এই অপরাধীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার আর কোনো উপায় নেই। অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ভুক্তভোগীর পরিবার পুলিশের দ্বারস্থ হয় এবং আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ঠাকুরগাঁও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি মো. শাহজাহান আলী গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, এই পৈশাচিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি সুনির্দিষ্ট মামলা রুজু করা হয়েছে। পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করছে এবং ঘটনার পর থেকেই আত্মগোপনে থাকা অভিযুক্ত ইউপি সদস্য আলাউদ্দীনকে গ্রেপ্তারের জন্য জোরালো অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত