৩২ কোটি টাকার মাদক ধ্বংস করল বিজিবি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৩ বার
৩২ কোটি টাকার মাদক ধ্বংস করল বিজিবি

প্রকাশ: ২৯ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মাদক আমাদের জাতীয় জীবনে এমন এক ভয়ংকর ব্যাধি হয়ে দেখা দিয়েছে যা কেবল যুবসমাজকেই ধ্বংস করছে না, বরং সমগ্র জাতির অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তিকে ভেতর থেকে চরমভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে। সীমান্ত এলাকার চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম্য রুখতে এবং দেশের তরুণ প্রজন্মকে মাদকের মরণসংকট থেকে রক্ষা করতে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো প্রতিনিয়ত নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। এরিই ধারাবাহিকতায় সাতক্ষীরা জেলার সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকাগুলোতে বিভিন্ন সময় পরিচালিত সফল ও সাঁড়াশি অভিযানে জব্দ করা প্রায় বত্রিশ কোটি টাকার বিশাল পরিমাণ অবৈধ মাদকদ্রব্য আনুষ্ঠানিকভাবে ধ্বংস করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবির নীলডুমুর ব্যাটালিয়ন, যা ১৭ বিজিবি নামে পরিচিত। আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর এই বিপুল পরিমাণ মাদক ধ্বংসের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আপসহীন মনোভাবের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো।

গত মঙ্গলবার বেলা ১১টায় সাতক্ষীরার নীলডুমুর ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরের নির্ধারিত প্রাঙ্গণে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশে এই মাদকদ্রব্য ধ্বংসকরণ অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়। এই মহতী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম রিজিয়নের সম্মানিত রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুল হাসান, পিবিজিএম, বিপিএম (সেবা), বিজিওএম, পিএসসি। সীমান্ত সুরক্ষা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা বিজিবির প্রতিটি সদস্যকে সব সময় পেশাগত দায়িত্ব পালনে অত্যন্ত অনুপ্রাণিত করে আসছে। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির উপস্থিতি মাদকবিরোধী কার্যক্রমে নিয়োজিত সৈনিকদের মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজিবির নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী জানা যায়, ২০২৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১১ জুলাই পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর, দেবহাটা এবং কালীগঞ্জ সীমান্ত এলাকায় বিজিবির বিভিন্ন টহল দল ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করে। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও সংবেদনশীল এই সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে চোরাচালান রোধ করতে গিয়ে বিজিবি সদস্যরা এই সময় মোট একচল্লিশ জন চোরাকারবারি ও মাদক ব্যবসায়ীকে হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম হন। এসব সফল অভিযানে বিভিন্ন ধরনের চোরাচালানকৃত পণ্যের সর্বমোট বাজারমূল্য ছিল প্রায় একান্ন কোটি পঁচাশি লাখ উনআশি হাজার সাতানব্বই টাকা। জব্দকৃত এই বিশাল পরিমাণের চোরাচালান পণ্যের মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে প্রায় একত্রিশ কোটি ৯৪ লাখ ৩৪ হাজার ৩ শত ৫০ টাকা মূল্যের বিভিন্ন ক্যাটাগরির মারাত্মক সব মাদকদ্রব্য অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া মেনে জনসমক্ষে ধ্বংস করা হলো।

ধ্বংস করা এই বিশাল মাদকভান্ডারের মধ্যে বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের দীর্ঘ এক পরিসংখ্যান রয়েছে, যা থেকে সীমান্ত এলাকার মাদকের ভয়াবহতা সহজেই অনুমান করা যায়। বিজিবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জব্দকৃত মাদকের তালিকায় ছিল চারশ ছয় বোতল বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিদেশি মদ, পনেরো হাজার আটাত্তর বোতল ফেনসিডিল ও সমজাতীয় কফ সিরাপ, আঠারো হাজার ছয়শ চৌান্ন পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, এবং পঁচাত্তর হাজার সাতশ ছেষট্টি প্যাকেট ভারতীয় পাতার বিড়ি। এছাড়াও এর মধ্যে যুক্ত ছিল তিন দশমিক একাশী কেজি গাঁজা, একুশ লাখ ৭৬ হাজার দুইশ সাতান্ন পিস বিভিন্ন ধরনের অবৈধ ও নিষিদ্ধ ওষুধ, এক হাজার চারশ সত্তর পাতা সুখি বড়ি, পনেরো হাজার সাতশ ছেচল্লিশ পিস অন্যান্য মাদকজাতীয় ট্যাবলেট, এক কেজি খাঁটি হেরোইন, আট বোতল একশ মিলিলিটার ও ছয় বোতল পঞ্চাশ মিলিলিটার এলএসডি এবং অত্যন্ত ভয়ংকর মাদক হিসেবে পরিচিত দুই দশমিক চারশ কেজি ক্রিস্টাল মেথ বা আইস।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই নীলডুমুর ব্যাটালিয়নের সুযোগ্য অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার আবু সহল আব্দুল্লাহ, পিএসসি উপস্থিত সকল অতিথি ও গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাগত জানিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ ও তথ্যবহুল বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে গত কয়েক বছর ধরে সীমান্ত এলাকায় কীভাবে চোরাকারবারিরা নতুন নতুন কৌশলে মাদক পাচারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং বিজিবি কীভাবে অত্যন্ত পেশাদারিত্ব ও সাহসিকতার সঙ্গে সেই সমস্ত অপচেষ্টা ব্যর্থ করে দিচ্ছে, তার একটি চিত্র তুলে ধরেন। তাঁর এই স্বাগত বক্তব্যের পরই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুল হাসান অত্যন্ত উদ্দীপনামূলক ও দিকনির্দেশনামূলক প্রধান অতিথির ভাষণ প্রদান করেন, যা উপস্থিত সকলের বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করে।

প্রধান অতিথির ভাষণে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুল হাসান অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। দেশের সীমান্তরক্ষী এই বাহিনী শুধু সীমান্ত পাহারা দেওয়ার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং দেশের ভেতর মাদকের বিস্তার রোধেও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন যে, বিজিবির সাহসী সদস্যরা দিনরাত যেকোনো প্রতিকূল আবহাওয়া ও ঝুঁকির পরোয়া না করে সীমান্তে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দায়িত্ব পালন করছেন বলেই আজকের দিনে অনেক বড় বড় মাদকের চালান দেশে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সীমান্তে বিজিবির এই কঠোর অবস্থানের কারণে চোরাকারবারিরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

মাদককে একটি বহুমাত্রিক ও গভীর সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে প্রধান অতিথি বলেন যে, কেবল পুলিশ বা বিজিবি দিয়ে পুরোপুরি মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়, কারণ এটি সমাজের প্রতিটি স্তরে শিকড় গেড়ে বসেছে। এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা একান্তভাবে প্রয়োজন। তিনি দেশের যুবসমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং এর ভয়াবহ কুফল সম্পর্কে সর্বসাধারণের মাঝে ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধি করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। পাশাপাশি, মাদকবিরোধী একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য দেশের শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় গুরু ও জনপ্রতিনিধিদেরসহ সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।

উক্ত মাদকদ্রব্য ধ্বংসকরণ অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন খুলনা সেক্টরের সম্মানিত সেক্টর কমান্ডার, সাতক্ষীরা জেলার পুলিশ সুপার, জেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা, র‍্যাব-৬ এর প্রতিনিধি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, কাস্টমস ও বন বিভাগের প্রতিনিধিরা। এছাড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং কোস্ট গার্ডের স্থানীয় দায়িত্বশীল কর্মকর্তাগণের পাশাপাশি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অসংখ্য সাংবাদিক এই গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টের সংবাদ সংগ্রহ করতে উপস্থিত ছিলেন। সবার উপস্থিতিতে এবং যথাযথ আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার মাধ্যমেই নির্ধারিত সময়ে জব্দকৃত এই বিপুল পরিমাণ মাদক আগুন দিয়ে সম্পূর্ণ পুড়িয়ে ও ধ্বংস করা হয়, যা এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক স্বস্তি ও প্রশংসার জন্ম দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com