প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যচুক্তিকে প্রকৃত অর্থে সমঝোতাভিত্তিক চুক্তি নয়, বরং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আদেশনামা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অর্থনীতিবিদ ও লেখক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তাঁর অভিযোগ, এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। এসব সিদ্ধান্তের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ এবং জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সরকারের অবস্থান পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিকেলে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে আয়োজিত এক সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে আনু মুহাম্মদ এসব কথা বলেন। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্যচুক্তি বাতিলের দাবিতে এই সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি। সমাবেশে অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক, গবেষক, চিকিৎসক, শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।
আনু মুহাম্মদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বাণিজ্যচুক্তি হয়েছে, সেটিকে সাধারণ অর্থে সমঝোতাভিত্তিক চুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর ভাষায়, এটি ট্রাম্পের ‘আদেশনামা’। তিনি মনে করেন, গণতন্ত্রকে শুধু নির্বাচনে ভোট দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর জনগণের বাস্তব কর্তৃত্ব কতটা রয়েছে, সেটিই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তাঁর অভিযোগ, দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিষয়ে জনগণের মতামত ও স্বার্থ যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না।
সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, একটি দেশের সরকার কী ধরনের অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করবে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কী শর্তে অংশ নেবে এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে জনগণের জীবনযাত্রা ও ভবিষ্যৎ সরাসরি যুক্ত। তাই এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনস্বার্থ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আনু মুহাম্মদের মতে, জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো চুক্তি বা নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে নাগরিকদের নীরব দর্শক হয়ে থাকা উচিত নয়।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রসঙ্গ টেনে আনু মুহাম্মদ বলেন, ব্রিটিশরা নিজেদের শাসন ও শোষণ টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে কাজে লাগিয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান সরকারও দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রশ্ন থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে দিতে কৃত্রিম বিভাজন তৈরির চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। সেই স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রের ওপর মানুষের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে জনগণের স্বার্থ উপেক্ষিত হলে স্বাধীনতার চেতনা ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আনু মুহাম্মদ আরও অভিযোগ করেন, দেশের পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে সরকার জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং বিদেশি শক্তির স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে কাজ করছে। তাঁর এই বক্তব্য ছিল সরকারের পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনার অংশ। তিনি মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি এবং বন্দর পরিচালনার উদ্যোগের মতো বিষয়গুলোতে সরকারের অবস্থান পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। তবে এসব অভিযোগ ও মূল্যায়ন সমাবেশে বক্তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন; চুক্তির প্রকৃত শর্ত, সম্ভাব্য প্রভাব এবং সরকারের বক্তব্য মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি ও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ।
সমাবেশে গবেষক মাহতাব উদ্দীন আহমেদও মার্কিন বাণিজ্যচুক্তির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, চুক্তিটি বহাল থাকলে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, চুক্তির শর্তের কারণে পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এসব সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে চুক্তির শর্তাবলি জনসমক্ষে প্রকাশ এবং সেগুলোর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানি, বিদেশি বিনিয়োগ, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তির সম্পর্ক রয়েছে। ফলে কোনো চুক্তি দেশের জন্য কী ধরনের সুবিধা বা দায় তৈরি করবে, তা নির্ভর করে এর সুনির্দিষ্ট শর্ত, শুল্কব্যবস্থা, বাণিজ্যিক ছাড়, বিনিয়োগের বিধান এবং বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ার ওপর। আন্দোলনকারীরা এসব বিষয় নিয়ে উদ্বেগ জানালেও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত বিশ্লেষণ ছাড়া সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েও সমাবেশে সমালোচনা করা হয়। গবেষক মাহতাব উদ্দীন আহমেদ বলেন, টার্মিনাল ইজারার পূর্ণাঙ্গ শর্ত ও চুক্তি প্রকাশ না করায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ে জনগণের সামনে পর্যাপ্ত তথ্য তুলে ধরা হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। দেশের শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানি, তৈরি পণ্য রপ্তানি এবং সামগ্রিক সরবরাহব্যবস্থায় এই বন্দরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বন্দরের কোনো টার্মিনাল পরিচালনা, আধুনিকায়ন কিংবা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতি, বাণিজ্যিক সক্ষমতা, কর্মসংস্থান ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থও জড়িত। এ ধরনের সিদ্ধান্তে ইজারার মেয়াদ, বিনিয়োগের পরিমাণ, মুনাফা বণ্টন, পরিচালনাগত দায়িত্ব, শ্রমিকদের অধিকার এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের সীমা স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা সমাবেশে বলেন, দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে নানা সমস্যা থাকা সত্ত্বেও সরকার একের পর এক কেনাকাটা ও চুক্তির মাধ্যমে জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে সরকারি ব্যয়, উন্নয়ন অগ্রাধিকার এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের জবাবদিহির প্রশ্ন উঠে আসে। অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের সমন্বয়ক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতনও সরকারের নীতির সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, দেশের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনের তুলনায় বিদেশি শক্তিকে সন্তুষ্ট রাখার বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্তে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন চিকিৎসক হারুন অর রশিদ, বাহাদুর শাহ পার্কের ঐতিহ্য সংরক্ষণ সংগ্রাম পরিষদের সদস্যসচিব আখতারুজ্জামান খান এবং বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি মানস নন্দী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের নেতা ইভান তাহসীব।
বক্তারা মনে করেন, আন্তর্জাতিক চুক্তি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ বন্দর পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ, বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা দরকার। তাঁদের মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত নয়, যা দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতা, শ্রমিকদের অধিকার কিংবা দেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে। একই সঙ্গে তাঁরা সরকারের কাছে চুক্তির শর্তাবলি প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জনপরিসরে আলোচনার সুযোগ তৈরির দাবি জানান।
সমাবেশ শেষে অংশগ্রহণকারীরা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি বাহাদুর শাহ পার্ক ও আশপাশের সড়ক প্রদক্ষিণ করে। মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি বাতিল এবং নিউমুরিং টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ পুনর্বিবেচনার দাবিতে তাঁরা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।
সব মিলিয়ে, বাহাদুর শাহ পার্কের এই সমাবেশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তি, রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এসেছে। আনু মুহাম্মদ ও অন্য বক্তারা সরকারের সিদ্ধান্তগুলোর সমালোচনা করে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এখন এসব বিতর্কের কেন্দ্রীয় বিষয় হলো চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্ত, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ, স্বাধীন অর্থনৈতিক মূল্যায়ন এবং সরকারের ব্যাখ্যার মাধ্যমে এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হলে জনমনে তৈরি হওয়া উদ্বেগ ও বিতর্কের বাস্তব ভিত্তি আরও ভালোভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত