কৃষি ঋণে সুদের হার কমিয়ে ৭ শতাংশ করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার
কৃষি ঋণে সুদের হার কমিয়ে ৭ শতাংশ করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কৃষি খাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে স্বল্প সুদে ঋণের সুযোগ আরও বিস্তৃত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগের আওতায় ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে দেওয়া ঋণের সুদ বা মুনাফার সর্বোচ্চ হার ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট কৃষক, উদ্যোক্তা ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট গ্রাহকের জন্য তুলনামূলক কম খরচে ব্যাংকঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগ-১ থেকে রোববার এ বিষয়ে সংশোধিত নির্দেশনা জারি করা হয়। নতুন নির্দেশনায় অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর জন্য পুনঃঅর্থায়নের সুদ বা মুনাফার হার ৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদ বা মুনাফা নিতে পারবে। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় দেওয়া অর্থায়নের ক্ষেত্রেও একই সীমা প্রযোজ্য হবে।

কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে ঋণের খরচ কমানোকে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে দেখা হয়। কারণ কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত অনেক কৃষক ও উদ্যোক্তার জন্য ব্যাংকঋণের সুদের হার বড় একটি ব্যয়। ঋণের সুদ কমলে উৎপাদনের প্রাথমিক ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, সংরক্ষণব্যবস্থা ও কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়তে পারে।

বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে এই উদ্যোগের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের এই অঞ্চলের বহু মানুষের জীবিকা সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষির সঙ্গে পশুপালন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বিপণনের মতো কার্যক্রমও স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব খাতে অর্থায়নের সুযোগ সহজ হলে কৃষিকে কেন্দ্র করে নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশোধিত নির্দেশনায় ঋণের মেয়াদ খাত ও প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু খাতে ঋণের সর্বোচ্চ মেয়াদ ১৮ মাস রাখা হয়েছে। এসব ঋণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড দেওয়ার সুযোগ থাকবে। ফলে ঋণ নেওয়ার পরপরই পুরো কিস্তি পরিশোধের চাপ গ্রাহকের ওপর পড়বে না।

অন্যদিকে নির্ধারিত অন্যান্য খাত ও প্রকল্পের জন্য ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৩৬ মাস করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে প্রকল্পের ধরন ও প্রয়োজন বিবেচনায় তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। কৃষিভিত্তিক প্রকল্পের উৎপাদনচক্র এবং আয় তৈরির সময় বিবেচনায় নিয়ে এই সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি গ্রাহককে ঋণ দেবে না। অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নির্ধারিত ৩ শতাংশ সুদ বা মুনাফায় পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা গ্রহণ করবে। পরে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদ বা মুনাফায় অর্থায়ন করবে ব্যাংকগুলো। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া সুবিধার একটি অংশ গ্রাহক পর্যায়ে কম সুদের ঋণ হিসেবে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, পুনঃঅর্থায়ন গ্রহণের তারিখ থেকে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাওনা আসল অর্থের পাশাপাশি ৩ শতাংশ সুদ বা মুনাফা পরিশোধ করতে হবে। এতে পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের অর্থ নির্ধারিত নিয়মে ঘুরিয়ে ব্যবহার করার সুযোগ থাকবে এবং নতুন গ্রাহকরাও ভবিষ্যতে এই সুবিধার আওতায় আসতে পারবেন।

তবে তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর জন্য কঠোর শর্তও রাখা হয়েছে। নির্ধারিত উদ্দেশ্যের বাইরে পুনঃঅর্থায়নের অর্থ ব্যবহার করা হলে কিংবা গ্রাহকের কাছ থেকে ৭ শতাংশের বেশি সুদ বা মুনাফা আদায় করা হলে সংশ্লিষ্ট অর্থের ওপর অতিরিক্ত ২ শতাংশ সুদ বা মুনাফা এককালীন আদায় করা হবে। এর মাধ্যমে ঋণের সুবিধা যাতে গ্রাহকের কাছে প্রকৃত অর্থে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

ঋণের সুদের হার নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে যাতে কোনো বিভ্রান্তি না থাকে, সে বিষয়েও নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকের শাখার ভেতরে ও বাইরে দৃশ্যমান স্থানে ব্যানার স্থাপন করে জানাতে হবে যে এই তহবিলের আওতায় গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদ বা মুনাফায় ঋণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিশেষ প্রচারণার মাধ্যমে সম্ভাব্য গ্রাহকদের এই সুবিধার বিষয়ে জানাতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, কারণ অনেক কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যাংকঋণের সুযোগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না জানার কারণে সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। ব্যাংকগুলো যদি কার্যকরভাবে প্রচারণা চালায়, তাহলে নতুন উদ্যোক্তা ও কৃষকের কাছে কম সুদের এই অর্থায়ন সুবিধা পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়বে।

কৃষি খাতে অর্থায়ন সহজ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া। অনেক সময় কৃষক বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, জামানত ও ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে ঋণ নিতে সমস্যা হয়। নতুন তহবিলের অর্থ দ্রুত ও সহজ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া গেলে এর অর্থনৈতিক সুফল আরও বাড়তে পারে।

কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্দেশ্যও এ উদ্যোগের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত। কৃষিপণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে বিনিয়োগ বাড়লে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের মূল্য সংযোজন করা সম্ভব হবে। এতে কৃষক শুধু কাঁচা পণ্য বিক্রির ওপর নির্ভর না করে কৃষিভিত্তিক ব্যবসার বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

কৃষি খাতে কম সুদের ঋণ বাড়লে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়তে পারে। উন্নত সেচব্যবস্থা, কৃষিযন্ত্র, ফসল সংরক্ষণ, গুদাম, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পরিবহনব্যবস্থায় বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ফসল কাটার পর নষ্ট হয়ে যাওয়া কমানো গেলে কৃষক ও ভোক্তা—দুই পক্ষই উপকৃত হতে পারে।

তবে শুধু কম সুদের ঋণই কৃষি খাতের সব সমস্যার সমাধান নয়। ঋণ পাওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের ন্যায্য দাম, বাজারব্যবস্থা, মানসম্মত বীজ ও সার, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা প্রয়োজন। ঋণ নিয়ে উৎপাদন করার পর বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়া গেলে কৃষকের জন্য সেই ঋণ পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে যেতে পারে।

এ কারণে নতুন পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে অর্থ কতটা সঠিকভাবে খাতে পৌঁছায় এবং প্রকৃত উদ্যোক্তারা কতটা সহজে তা ব্যবহার করতে পারেন তার ওপর। ব্যাংকগুলোকে একই সঙ্গে ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং গ্রাহকের ওপর অযৌক্তিক অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা চাপানো থেকে বিরত থাকতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশোধিত নির্দেশনায় আগের সার্কুলারের অন্যান্য শর্ত অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন সুদের হার ও সংশ্লিষ্ট পরিবর্তনগুলো কার্যকর হলেও আগের নির্দেশনায় থাকা অন্যান্য যোগ্যতা ও শর্ত বহাল থাকবে।

সামগ্রিকভাবে, কৃষি ঋণের সর্বোচ্চ সুদ বা মুনাফার হার ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত কৃষক ও কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য স্বস্তির বার্তা হতে পারে। বিশেষ করে ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল যদি দ্রুত ও সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক বিনিয়োগের পরিধি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

দেশের কৃষি অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। কম সুদের এই অর্থায়ন সেই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে। এখন মূল বিষয় হলো, ঘোষিত সুবিধা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে কৃষক ও উদ্যোক্তাদের হাতে কতটা পৌঁছায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত