হাজারীবাগে আধুনিক পশু জবাইখানায় কার্যক্রম শুরু

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • ২ বার
হাজারীবাগে আধুনিক পশু জবাইখানায় কার্যক্রম শুরু

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর হাজারীবাগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতাধীন আধুনিক পশু জবাইখানায় আনুষ্ঠানিকভাবে পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে পরিচালিত এই জবাইখানাকে নগরবাসীর জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত মাংস সরবরাহের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখছে সিটি করপোরেশন।

সোমবার সকালে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হাজারীবাগ আধুনিক পশু জবাইখানার কার্যক্রম উদ্বোধন করেন ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম। অনুষ্ঠানে সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিনিধিসহ বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, নগরবাসীর জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সিটি করপোরেশনের চলমান কার্যক্রমের মধ্যে আধুনিক পশু জবাইখানার যাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তার মতে, পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা গেলে নগরবাসীর জন্য নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের পথ আরও সহজ হবে।

প্রচলিত পদ্ধতিতে শহরের বিভিন্ন স্থানে পশু জবাইয়ের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত নানা সমস্যা তৈরি হয়। অপরিকল্পিতভাবে পশু জবাই হলে রক্ত, বর্জ্য ও অন্যান্য দূষিত পদার্থ আশপাশের পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি মাটি, পানি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। হাজারীবাগের আধুনিক জবাইখানায় এসব সমস্যা কমানোর লক্ষ্যেই সমন্বিত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ডিএসসিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এখানে পশু জবাইয়ের আগে লাইভস্টক বিশেষজ্ঞ বা ভেটেরিনারি সার্জনের মাধ্যমে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। কোনো পশু রোগাক্রান্ত বা স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ কি না, তা যাচাইয়ের পর জবাই প্রক্রিয়ায় নেওয়া হবে। ফলে বাজারে আসা মাংসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়েই নজরদারি করা সম্ভব হবে।

স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর নির্ধারিত আধুনিক ব্যবস্থায় পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাত করা হবে। সিটি করপোরেশনের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয় ও জীবাণুমুক্ত পদ্ধতিতে পরিচালনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণে মানুষের সরাসরি হাতের স্পর্শ কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মাংস প্রস্তুত ও সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।

নগরবাসীর প্রতি বাজার থেকে মাংস কেনার সময় পশুটি কোথায় জবাই করা হয়েছে, তা যাচাই করে নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন ডিএসসিসি প্রশাসক। কারণ নিরাপদ মাংস নিশ্চিত করতে শুধু জবাইখানার আধুনিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; মাংস পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিক্রির ক্ষেত্রেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা জরুরি।

হাজারীবাগের জবাইখানার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো উন্নত চিলিং ও কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থা। পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাতের পর নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা গেলে মাংস দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে। একই সঙ্গে মাংসের সতেজতা ও গুণগত মান দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হয়।

রাজধানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরে খাদ্য সংরক্ষণের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অনিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় মাংস রাখা হলে এর গুণগত মান নষ্ট হতে পারে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আধুনিক চিলিং ও কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থা ব্যবহারের মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও প্রকল্পটিতে গুরুত্ব পেয়েছে। জবাইখানায় পরিবেশবান্ধব বর্জ্য শোধন প্ল্যান্ট বা ইটিপি স্থাপন করা হয়েছে। পশু জবাইয়ের সময় উৎপন্ন রক্ত ও দূষিত পানি সরাসরি পরিবেশে না ফেলে শোধন করার ব্যবস্থা থাকবে। এর ফলে আশপাশের এলাকায় দুর্গন্ধ এবং পানি ও মাটিদূষণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।

পশুর বিভিন্ন অংশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করার উদ্যোগ রয়েছে। পশুর রক্ত, হাড় ও খুর প্রক্রিয়াজাত করে সার ও পশুখাদ্য তৈরির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ জবাইয়ের পর যে অংশগুলো সাধারণত বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত হয়, সেগুলোর একটি অংশ পুনর্ব্যবহার করে অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে।

চামড়া ছাড়ানোর ক্ষেত্রেও আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হবে। নির্ভুলভাবে চামড়া ছাড়াতে পারলে চামড়ার ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে এবং এর গুণগত মান বজায় থাকবে। এর ফলে পশুর চামড়ার প্রকৃত বাজারমূল্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণের পুরো প্রক্রিয়াটি আরও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

জবাইখানার কার্যক্রম পরিচালনা ও রাজস্ব সংগ্রহের জন্য ইতোমধ্যে একটি সাব-কমিটি গঠন করেছে ডিএসসিসি। সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক করে গঠিত এই কমিটি বর্তমানে সাময়িকভাবে রাজস্ব আহরণের দায়িত্ব পালন করছে। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী চালানের মাধ্যমে দৈনিক ভিত্তিতে রাজস্ব সংগ্রহ করা হবে।

জবাইখানায় পশু জবাইয়ের জন্য নির্ধারিত হারে রাজস্ব দিতে হবে। প্রতিটি ছাগল ও ভেড়ার জন্য ২৫ টাকা এবং প্রতিটি গরু ও মহিষের জন্য ১০০ টাকা হারে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ডিএসসিসির আদর্শ কর তফসিল এবং ‘হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) বিধিমালা ২০২৫’ অনুযায়ী এই রাজস্ব সংগ্রহ করা হবে।

হাজারীবাগের আধুনিক পশু জবাইখানায় প্রতিদিন ভোর ৪টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাতের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। নির্দিষ্ট সময়সীমায় কার্যক্রম পরিচালনার ফলে জবাইখানার ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পরবর্তী পর্যায়ে মাংস পরিবহনের মধ্যে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

রাজধানীতে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে পশু জবাইয়ের স্থান ও পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। শহরের বিভিন্ন এলাকায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে পশু জবাইয়ের কারণে পরিবেশদূষণ ও জনস্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। আধুনিক জবাইখানার মাধ্যমে এসব কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা গেলে সেই ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।

তবে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি এর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যন্ত্রপাতি সঠিকভাবে পরিচালনা, পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, বর্জ্য শোধন এবং মাংস সংরক্ষণের প্রতিটি ধাপ নিয়মিত তদারক করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী ও মাংস বিক্রেতাদেরও নির্ধারিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

নগরবাসীর জন্য নিরাপদ মাংস নিশ্চিত করতে জবাইখানা থেকে মাংস বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নজরদারি প্রয়োজন। মাংস সঠিক তাপমাত্রায় পরিবহন ও সংরক্ষণ না করা হলে আধুনিক জবাইখানার সুবিধার একটি বড় অংশই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই জবাইখানার পাশাপাশি পরবর্তী ধাপগুলোকেও স্বাস্থ্যসম্মত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

হাজারীবাগের আধুনিক পশু জবাইখানার কার্যক্রম শুরু হওয়ায় রাজধানীর নিরাপদ মাংস সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হলো। পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা থেকে শুরু করে স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়াজাতকরণ, চিলিং ও কোল্ড স্টোরেজ, বর্জ্য শোধন এবং পশুর বিভিন্ন অংশ পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে এটি প্রচলিত জবাই ব্যবস্থার তুলনায় একটি সংগঠিত বিকল্প তৈরি করতে পারে।

এখন এই উদ্যোগের সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে বাস্তবে এর ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর হয় এবং মাংস ব্যবসায়ীরা কতটা নিয়ম মেনে এই সুবিধা ব্যবহার করেন তার ওপর। সঠিক তদারকি ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা গেলে হাজারীবাগের এই আধুনিক জবাইখানা শুধু নিরাপদ মাংস সরবরাহেই নয়, রাজধানীর পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সুরক্ষাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত