প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আধুনিক প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও শিল্প উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল খনিজের সরবরাহে চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য ক্রমেই বড় কৌশলগত ঝুঁকি হয়ে উঠছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জামের উৎপাদন যখন এসব খনিজের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, তখন সরবরাহ ব্যবস্থায় সামান্য বিঘ্নও আন্তর্জাতিক বাজার ও জাতীয় নিরাপত্তায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে বিরল খনিজের খনন, পরিশোধন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে চীনের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ রেয়ার আর্থ খনন এবং প্রায় ৯০ শতাংশ পৃথকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ চীনের নিয়ন্ত্রণে। ফলে খনিজগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাওয়া গেলেও সেগুলোকে ব্যবহারযোগ্য শিল্প উপাদানে রূপান্তরের ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি।
বিষয়টি নতুন নয়। ২০১০ সালে জাপানের সঙ্গে একটি বিরোধপূর্ণ দ্বীপকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সময় চীন গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিরল খনিজের রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছিল। ওই ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয় এবং উন্নত দেশগুলো প্রথমবারের মতো ব্যাপকভাবে উপলব্ধি করে, কৌশলগত এই কাঁচামালের সরবরাহ কতটা ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত।
তবে সেই অভিজ্ঞতার পরও বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রত্যাশিত মাত্রায় পরিবর্তন আসেনি। বরং প্রযুক্তির ব্যবহার যত বেড়েছে, রেয়ার আর্থের গুরুত্বও তত বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, স্মার্টফোন, উন্নত কম্পিউটার, বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন, বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি এবং অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে এসব খনিজের ব্যবহার রয়েছে।
রেয়ার আর্থ নামটি শুনে অনেকের মনে হতে পারে, এগুলো পৃথিবীতে অত্যন্ত দুর্লভ। বাস্তবে বেশ কিছু বিরল খনিজ পৃথিবীর ভূত্বকে মোটামুটি পাওয়া যায়। সমস্যা হলো এগুলো সাধারণত খুব কম ঘনত্বে ছড়িয়ে থাকে। ফলে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন, পৃথকীকরণ ও পরিশোধনের জন্য বিপুল বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তি এবং জটিল অবকাঠামোর প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে এসব প্রক্রিয়ায় পরিবেশদূষণের ঝুঁকিও থাকে।
এই কারণেই একসময় যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক পশ্চিমা দেশ নিজস্ব উৎপাদন কমিয়ে অপেক্ষাকৃত কম খরচে চীন থেকে এসব উপাদান আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর ফলে শিল্প উৎপাদনের ব্যয় কমলেও ধীরে ধীরে সরবরাহব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই নির্ভরতা এখন নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রেয়ার আর্থ নিয়ে উদ্বেগও তীব্র হয়েছে। গত বছর দুই দেশের বাণিজ্যিক উত্তেজনার সময় চীন কিছু বিরল খনিজের রপ্তানি সীমিত করায় পশ্চিমা দেশগুলো সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা আরও স্পষ্টভাবে দেখতে পায়। ভবিষ্যতে নতুন করে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলে শিল্প উৎপাদন ও প্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
আসন্ন নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এক বছরের বাণিজ্যিক সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এর আগে বিরল খনিজ নিয়ে নতুন কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে কিছু বিরল খনিজের দাম বাড়ার প্রবণতা বাজারের উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চীননির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রও বড় আকারের উদ্যোগ নিচ্ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মজুত গড়ে তোলা ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। মার্কিন কর্মকর্তারা এই উদ্যোগকে রেয়ার আর্থ খাতে একটি নতুন ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির যে বৃহৎ বৈজ্ঞানিক ও শিল্প উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন সক্ষমতা দিয়েছিল, সেই উদাহরণ থেকেই তুলনাটি করা হয়েছে।
তবে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ দিয়ে এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। কারণ রেয়ার আর্থ সরবরাহব্যবস্থা একটি বৈশ্বিক শিল্প নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। খনিজ উত্তোলনের পাশাপাশি তা পৃথকীকরণ, পরিশোধন, ধাতু তৈরি এবং শেষ পর্যন্ত শিল্পকারখানায় ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের অবকাঠামো প্রয়োজন। একটি দেশ কোনো একটি ধাপে সক্ষমতা অর্জন করলেও পুরো সরবরাহশৃঙ্খল গড়ে তুলতে সময় ও বিপুল বিনিয়োগ দরকার।
এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশ বিকল্প উৎস খুঁজছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল ও গ্রিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন অঞ্চলের খনিজ সম্পদের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রাজিলকে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটির বড় খনিজ সম্পদ রয়েছে এবং ভবিষ্যতে সেখানে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
তবে বিকল্প উৎস তৈরি করলেও নতুন সমস্যা সামনে আসতে পারে। রেয়ার আর্থের খনন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ পরিবেশের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। পানি ও মাটিদূষণ, খনির বর্জ্য এবং স্থানীয় পরিবেশব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে শুধু চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য যদি পরিবেশগত মান উপেক্ষা করে ব্যাপক খনন শুরু হয়, তাহলে নতুন ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিং গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে সামনে এসেছে। পুরোনো ইলেকট্রনিক পণ্য, বৈদ্যুতিক গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য শিল্পপণ্য থেকে ব্যবহৃত বিরল খনিজ পুনরুদ্ধারের প্রযুক্তি উন্নত করা গেলে নতুন করে খননের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। একইভাবে খনির বর্জ্য থেকে মূল্যবান উপাদান পুনরুদ্ধারের প্রযুক্তিও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পুনর্ব্যবহার একাই চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট হবে না। প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি যত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, তত দ্রুত নতুন কাঁচামালের প্রয়োজনও বাড়ছে। ফলে নতুন খনি, বিকল্প সরবরাহকারী, পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি এবং দক্ষ প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো—সবকিছুকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
এই বাস্তবতায় পশ্চিমা দেশগুলো বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় কমিশন, যুক্তরাজ্যসহ ৫৪টি অংশীদারকে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের একটি জোট গঠন করেছে। লক্ষ্য হলো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে খনিজ সরবরাহ, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা ভাগ করে নেওয়া।
ইউরোপের জন্য বিষয়টি আরও জটিল। চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে গিয়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়াও ইউরোপের জন্য নতুন কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই নিজেদের ভূখণ্ডে খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা গড়ে তোলা, মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা এবং নতুন সরবরাহকারী তৈরি করাকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।
ইউরোপ ২০২৫ সালের ‘ক্রিটিক্যাল র’ ম্যাটেরিয়ালস অ্যাক্টের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। চীনের বাইরে বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণের একটি বড় স্থাপনা ফ্রান্সে রয়েছে। পাশাপাশি ব্রাজিলের সঙ্গে খনিজসম্পদ নিয়ে সহযোগিতার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কিন্তু অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও পরিবেশগত অনুমোদনের মতো নানা কারণে ইউরোপের অগ্রগতি এখনও প্রত্যাশার তুলনায় ধীর।
রেয়ার আর্থ নিয়ে এই প্রতিযোগিতা তাই শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়। এটি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। ভবিষ্যতের বৈদ্যুতিক গাড়ি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর প্রযুক্তি থেকে শুরু করে উন্নত সামরিক ব্যবস্থা—সব ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় উপকরণের নিরাপদ সরবরাহ জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠছে।
চীনের দীর্ঘদিনের অবকাঠামো, দক্ষতা ও বাজার নিয়ন্ত্রণের কারণে রাতারাতি বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব নয়। পশ্চিমা দেশগুলোকে একই সঙ্গে নতুন খনি, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে হবে। এর পাশাপাশি মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি ও কৌশলগত মজুত গড়ে তুলতে হবে।
বিশ্ব অর্থনীতি যখন দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে, তখন রেয়ার আর্থ আর শুধু শিল্পের একটি কাঁচামাল নয়। এটি এখন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা এবং ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি। ফলে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর পশ্চিমা উদ্যোগ সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে তারা কত দ্রুত একটি বহুমুখী, নির্ভরযোগ্য এবং পরিবেশগতভাবে টেকসই সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে তার ওপর।