পণ্য খালাসে অহেতুক বিলম্ব নয়, কাস্টমসকে এনবিআরের নির্দেশ

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সহজ করতে পণ্যচালান পরীক্ষার নামে অহেতুক হয়রানি এবং পণ্য খালাসে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। দেশের সব কাস্টমস হাউসের কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো নতুন নির্দেশনায় পণ্যচালান পরীক্ষা, নথি দাখিল ও অ্যাসেসমেন্ট প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় ধাপ কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

রোববার (৩০ আগস্ট) দেশের সব কাস্টম হাউসের কর্মকর্তাদের কাছে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠায় এনবিআর। এতে মোট ১৩টি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে কাস্টমসের নানা জটিলতা, অপ্রয়োজনীয় নথি চাওয়া, বারবার পণ্য পরীক্ষা এবং পণ্য খালাসে বিলম্ব নিয়ে ব্যবসায়ীরা সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা এনবিআরের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা গেলে আমদানি-রপ্তানির সময় ও ব্যয় কমানোর পাশাপাশি ব্যবসার পরিবেশ উন্নত হতে পারে। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কাস্টমস কর্মকর্তাদের সক্ষমতা ও বিদ্যমান প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এনবিআরের আইন ও বিধি অনুযায়ী যেসব নথি প্রয়োজন, তার বাইরে আমদানি বা রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কোনো নথি চাওয়া যাবে না। অনলাইনে যেসব নথি ইতোমধ্যে দাখিল করা হয়েছে, সেগুলো আবার ম্যানুয়ালি জমা দেওয়ার প্রয়োজন হবে না।

এ ছাড়া যেসব পণ্যচালান ঝুঁকিপূর্ণ নয় এবং যেসব চালানের ক্ষেত্রে এনবিআরের পক্ষ থেকে পৃথক কোনো নির্দেশনা নেই, সেসব নথি অপ্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো বন্ধ করতে বলা হয়েছে। এতে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া দ্রুত হওয়ার পাশাপাশি কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাজও কমবে বলে মনে করছে এনবিআর।

পণ্যচালান পরীক্ষা নিয়েও নির্দেশনায় কড়াকড়ি করা হয়েছে। শুল্ক ফাঁকির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য বা সন্দেহ না থাকলে একই পণ্যচালান একাধিকবার সরেজমিন পরীক্ষা করা যাবে না। পণ্য খালাসের সময় রাজস্ব ঝুঁকির ভিত্তিতে চালান বাছাই করতে হবে। একই সঙ্গে সরেজমিন পরীক্ষার ফলাফল মূল্যায়নের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে কোনো চালান পরীক্ষার জন্য নির্বাচন করা হবে কি না, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কাস্টমস অ্যাসেসমেন্ট প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় ধাপ পরিহারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। একই পণ্যচালান যাতে বারবার পরীক্ষা করতে না হয়, সেজন্য সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার কথা বলা হয়েছে।

বন্দর এলাকায় পণ্যজট কমাতেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন পড়ে থাকা বা নিলামযোগ্য পণ্য দ্রুত নিলামের আওতায় আনার পাশাপাশি রাজস্ব সুরক্ষায় কর্মকর্তাদের নজরদারি জোরদার করতে বলা হয়েছে। এর ফলে বন্দরে অপ্রয়োজনীয়ভাবে পণ্য জমে থাকার প্রবণতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এনবিআরের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এসব নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ব্যবসা সহজ করার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

তিনি বলেন, “আমরা বহুদিন ধরে এসব বিষয় বলে আসছিলাম। এনবিআরের এই সিদ্ধান্ত কাস্টম হাউসগুলোতে বাস্তবায়ন হলে প্রকৃত আমদানি-রপ্তানিকারকেরা লাভবান হবেন।”

তবে এনবিআরের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, বিশেষ করে নিচের স্তরের কিছু কর্মকর্তার অসহযোগিতা ও অনিয়মের কারণে ভালো উদ্যোগও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না।

মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা, বিশেষ করে নিচের স্তরের কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা ও টাকা কামানোর ধান্দার কারণে অনেক ভালো উদ্যোগের সঠিক বাস্তবায়ন হয় না।”

তিনি আরও বলেন, “যারা অনিয়মকারী বা ফাঁকিবাজ ব্যবসায়ী, তারা ঠিকই বের হয়ে যায়। সামান্য ভুলের কারণে ধরা খান ভালো ব্যবসায়ীরা।”

তাঁর মতে, প্রকৃত ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমানোর পাশাপাশি ইচ্ছাকৃতভাবে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, “যারা ফাঁকিবাজ, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।”

তবে এনবিআরের কর্মকর্তাদের একটি অংশ নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিয়ে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, বিদ্যমান জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক পণ্যচালান শনাক্তকরণ এবং পরীক্ষা আরও কার্যকরভাবে করা না গেলে রাজস্ব ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, নতুন নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, কাগজে-কলমে প্রক্রিয়া সহজ করা গেলেও কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে রাজস্ব সুরক্ষা কঠিন হতে পারে।

তিনি বলেন, বর্তমানে এনবিআরের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সফটওয়্যারের মাধ্যমে পণ্যচালানের ঝুঁকির মানদণ্ড নির্ধারণ করা হলেও চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ছাড়া অন্যান্য কাস্টম হাউসে এর ব্যবহার একইভাবে কার্যকর নয়। তাঁর মতে, আগে দেশের সব কাস্টম হাউসে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার এই প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ওই কর্মকর্তা বলেন, “যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা অনেকটা জনপ্রিয়তাবাদী ভাবনা থেকে দেওয়া। মাঠের বাস্তবতা এত সহজ নয়।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে এনবিআরের যে সফটওয়্যারের (অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড) মাধ্যমে পণ্যচালানের ঝুঁকির মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়, তা চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ছাড়া অন্য হাউসগুলোতে অনুসরণ করা হয় না। আগে সব কাস্টম হাউসে এটি নিশ্চিত করা দরকার।”

তাঁর মতে, নতুন নির্দেশনায় এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

তবে ব্যবসা সহজীকরণ ও রাজস্ব আদায়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। একদিকে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে প্রকৃত ঝুঁকিপূর্ণ চালান শনাক্ত করে শুল্ক ফাঁকি ঠেকাতে হবে।

এনবিআরের নতুন নির্দেশনা কার্যকর হলে আমদানি-রপ্তানিকারকদের জন্য পণ্য খালাসের সময় কমতে পারে এবং অপ্রয়োজনীয় নথিপত্র ও পুনরাবৃত্ত পরীক্ষার কারণে সৃষ্ট ব্যয়ও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বাস্তবায়ন, ঝুঁকিভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থা এবং কাস্টমসের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত