একধাপে সোনার দাম কমল ভরিতে ৭,১১৫ টাকা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার
একধাপে সোনার দাম কমল ভরিতে ৭,১১৫ টাকা

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

টানা কয়েক দফা মূল্যবৃদ্ধির পর দেশের স্বর্ণবাজারে বড় ধরনের স্বস্তির খবর এসেছে। একধাপে প্রতি ভরি সোনার দাম ৭ হাজার ১১৫ টাকা কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৪০ হাজার ৬২৮ টাকা। শনিবার সকাল ১০টা থেকে নতুন এই দাম কার্যকর হয়েছে।

স্বর্ণের দাম দীর্ঘদিন ধরেই দেশের সাধারণ মানুষের আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের জন্য যারা স্বর্ণ কেনার পরিকল্পনা করেন, তাদের কাছে দামের প্রতিটি পরিবর্তন বড় প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে স্বর্ণ কেনা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছিল। এমন পরিস্থিতিতে একদিনে ৭ হাজার টাকার বেশি দাম কমার খবর ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে।

বাংলাদেশের স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সংগঠন জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি বা পরিশোধিত সোনার দাম কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশের বাজারে নতুন করে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের ওঠানামা, ডলারের বিনিময় হার এবং স্থানীয় বাজারে কাঁচা সোনার মূল্য—সব মিলিয়ে দেশের স্বর্ণের দাম নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নতুন দামে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার মূল্য ২ লাখ ৪০ হাজার ৬২৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৯ হাজার ৭৮১ টাকা। ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার নতুন মূল্য ১ লাখ ৯৭ হাজার ৩৫৫ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ১৯৬ টাকা।

মূল্য কমানোর আগে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ছিল ২ লাখ ৪৭ হাজার ৭৪৩ টাকা। ২১ ক্যারেটের সোনার দাম ছিল ২ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরির দাম ছিল ২ লাখ ৩ হাজার ১৮৭ টাকা। সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯২০ টাকা। নতুন সিদ্ধান্তে সব ধরনের সোনার দামেই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।

বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে দামের এই ওঠানামা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বর্ণের দাম যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। একসময় যে স্বর্ণ মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের মধ্যে ছিল, সেটি এখন অনেকের জন্য বিলাসবহুল পণ্যে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বিয়ের মৌসুমে স্বর্ণের উচ্চমূল্য অনেক পরিবারকে বাজেট পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে।

চলতি বছরের শুরুতে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ২৯ জানুয়ারি একদিনে বড় অঙ্কের মূল্যবৃদ্ধির পর প্রতি ভরি ২২ ক্যারেটের সোনার দাম ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকায় পৌঁছায়। দেশের স্বর্ণবাজারের ইতিহাসে সেটি ছিল অন্যতম সর্বোচ্চ মূল্য। পরে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দাম কমতে শুরু করলেও স্বর্ণের বাজার এখনো অত্যন্ত অস্থির।

স্বর্ণকে সাধারণত নিরাপদ বিনিয়োগের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ, রাজনৈতিক উত্তেজনা, মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রাবাজারের অস্থিরতার সময় বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বেড়ে গেলে এর প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও পড়ে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। একাধিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ঘটনার কারণে কয়েক দিন দাম বাড়ার পর আবার উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা, মার্কিন ডলারের শক্তিশালী হওয়া এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন মূল্যায়ন স্বর্ণের দামে প্রভাব ফেলছে।

স্বর্ণ এমন একটি সম্পদ, যা নিজে কোনো সুদ বা নিয়মিত আয় দেয় না। ফলে উচ্চ সুদের পরিবেশে অনেক বিনিয়োগকারী বিকল্প বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকতে পারেন। অন্যদিকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়লে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা আবার বেড়ে যায়। এই দুই বিপরীত প্রবণতার কারণেই বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম দ্রুত ওঠানামা করে।

দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের পাশাপাশি স্থানীয় তেজাবি সোনার দাম বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বাংলাদেশে স্বর্ণের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি সরাসরি প্রভাব ফেললেও পরিবহন ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার, স্থানীয় বাজারের সরবরাহ পরিস্থিতি এবং অন্যান্য ব্যয়ও বিবেচনায় আসে।

স্বর্ণের দাম কমার এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পেতে পারেন সম্ভাব্য ক্রেতারা। বিশেষ করে যারা বিয়ের জন্য অলংকার কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য প্রতি ভরিতে কয়েক হাজার টাকা কমা উল্লেখযোগ্য বিষয়। তবে বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে এই স্বস্তি কত দিন থাকবে, তা এখনই বলা কঠিন।

অলংকার কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের আরও একটি বিষয় মাথায় রাখতে হয়। নির্ধারিত স্বর্ণের মূল্যের সঙ্গে গহনার নকশা ও তৈরির খরচ যোগ হয়। এছাড়া প্রযোজ্য কর ও অন্যান্য ব্যয়ও যুক্ত হতে পারে। ফলে বাজারে ঘোষিত প্রতি ভরির দাম এবং একটি নির্দিষ্ট অলংকার কিনতে ক্রেতার মোট ব্যয়ের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে।

এদিকে স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার বাজারেও নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রুপার দামেও পরিবর্তন এসেছে, যা স্বর্ণের তুলনায় কম দামের অলংকার ও বিনিয়োগের বিকল্প হিসেবে রুপার প্রতি আগ্রহী ক্রেতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ৩০৭ টাকা। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম ৫ হাজার ৭৪ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরির দাম ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা। সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার মূল্য ৩ হাজার ৩২৪ টাকা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনগুলোতে স্বর্ণের বাজার কোন দিকে যাবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান উত্তেজনা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, ডলারের অবস্থান এবং বড় বিনিয়োগকারীদের আচরণ—সবকিছুই স্বর্ণের দামে প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের ক্রেতাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাজারের সর্বশেষ মূল্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কারণ স্বর্ণের দাম কখনো কখনো খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের ওঠানামা হলে স্থানীয় বাজারেও দ্রুত নতুন মূল্য ঘোষণা করা হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতি ভরি ৭ হাজার ১১৫ টাকা কমার ঘটনা স্বর্ণবাজারে নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। সাম্প্রতিক উচ্চমূল্যের চাপের মধ্যে এই মূল্যহ্রাস ক্রেতাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিলেও বাজারের ভবিষ্যৎ এখনো পুরোপুরি অনিশ্চিত। বিশ্ববাজারের গতিপথ এবং স্থানীয় তেজাবি সোনার দামের ওপর নির্ভর করেই আগামী দিনে বাংলাদেশের স্বর্ণের বাজারে নতুন পরিবর্তন আসতে পারে।

স্বর্ণ শুধু অলংকার নয়, বাংলাদেশের বহু পরিবারের কাছে এটি আবেগ, সামাজিক ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার প্রতীক। তাই এর দামের প্রতিটি পরিবর্তন ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলে। শনিবারের এই বড় মূল্যহ্রাস তাই স্বর্ণবাজারে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন ক্রেতাদের অপেক্ষা—এই কমতির ধারা আরও কিছুদিন বজায় থাকে কি না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত