কঠিন সময়ে নরওয়ের সিংহাসনে নতুন রাজা হাকন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার
কঠিন সময়ে নরওয়ের সিংহাসনে নতুন রাজা হাকন

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজা হ্যারাল্ড পঞ্চমের মৃত্যুর পর নরওয়ের সিংহাসনে বসেছেন তাঁর ছেলে হাকন অষ্টম। তবে এটি শুধু একজন নতুন রাজার অভিষেক নয়, বরং নরওয়ের রাজতন্ত্রের জন্য একটি নতুন এবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা। দীর্ঘদিন ধরে মানুষের ভালোবাসা ও আস্থায় থাকা রাজা হ্যারাল্ডের উত্তরসূরি হিসেবে হাকনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—পূর্বসূরির গড়ে যাওয়া জনপ্রিয়তা ও জনবিশ্বাস ধরে রেখে আধুনিক নরওয়ের রাজতন্ত্রকে নতুন সময়ের সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া।

নরওয়ের সাধারণ মানুষের কাছে রাজা হ্যারাল্ড ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন রাষ্ট্রপ্রধান। তাঁর ব্যক্তিত্ব, রসবোধ এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ তাঁকে রাজপরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত করেছিল। বিভিন্ন সময়ে জনমত জরিপেও তাঁর প্রতি মানুষের গভীর আস্থার প্রতিফলন দেখা গেছে। তাঁর মৃত্যুর পর দেশজুড়ে শোকের আবহের মধ্যেই সিংহাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন হাকন।

১৯০৫ সালে সুইডেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর আধুনিক নরওয়েজীয় রাজতন্ত্রের যে পথচলা শুরু হয়েছিল, সেই ধারাবাহিকতায় হাকন হলেন দেশটির রাজতন্ত্রের চতুর্থ রাজা। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কাজের অংশ হিসেবে তিনি একটি বিশেষ মন্ত্রিসভা বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন এবং নিজের রাজকীয় উপাধি ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে তিনি তাঁর বাবার ব্যবহৃত মূলমন্ত্র ‘নরওয়ের জন্য সব কিছু’ গ্রহণ করেন। এই সিদ্ধান্তকে নরওয়ের রাজতন্ত্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজা হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য হাকন দীর্ঘদিন ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। যুবরাজ থাকাকালে তিনি বাবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও রাজকীয় দায়িত্ব পালনে তাঁকে সহযোগিতা করেছেন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজা হ্যারাল্ডের বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে হাকনের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাবা অসুস্থ থাকলে বা দেশের বাইরে থাকলে তিনি বহুবার রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

নিজের জীবনীতে রাজা হ্যারাল্ডও ছেলের প্রতি আস্থার কথা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, হাকন দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রস্তুত এবং ভবিষ্যতে নরওয়ের রাজতন্ত্রকে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিতে পারবেন। তবে ব্যক্তিত্বের দিক থেকে বাবা ও ছেলে কিছুটা ভিন্ন। রাজা হ্যারাল্ড ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও রসবোধসম্পন্ন ব্যক্তি। অন্যদিকে হাকনকে তুলনামূলকভাবে শান্ত ও সংযত স্বভাবের মানুষ হিসেবে দেখা হয়।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাকন জনসমক্ষে আরও খোলামেলা হয়েছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর রসবোধ এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষমতাও বেশি প্রকাশ পেয়েছে। রাজপরিবারের প্রবীণ সদস্যদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে পরিবারের এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের বড় অংশ সামলাতে হয়েছে। ফলে রাজা হওয়ার আগেই তিনি দায়িত্বের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।

১৯৭৩ সালে জন্মগ্রহণকারী হাকন প্রয়াত রাজা হ্যারাল্ড ও রানি সোনিয়ার সবচেয়ে ছোট সন্তান। মাত্র ১৭ বছর বয়সে, ১৯৯১ সালে তাঁর দাদা রাজা ওলাভ পঞ্চমের মৃত্যুর পর তিনি যুবরাজ হন। রাজপরিবারের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁর শিক্ষাজীবনে ছিল কিছুটা ভিন্নতা। তিনি স্থানীয় সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করেছেন, যা রাজপরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে ব্যতিক্রমী ছিল।

পরে তিনি চার বছর নৌবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৯৫ সালে নরওয়ের নৌ একাডেমি থেকে শিক্ষা সম্পন্ন করেন। তাঁর বাবা ও দাদার মতো যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়ে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলি ক্যাম্পাসে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি।

ছোটবেলায় রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে নিজের পরিচয় নিয়ে তিনি সব সময় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না বলেও জানা যায়। আত্মজীবনীতে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, স্কুলজীবনে রাজপরিবারের সদস্য হওয়ার বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে তাঁর অস্বস্তি হতো। সাধারণ পরিবেশে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিত্ব ও জনসাধারণের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।

হাকনের পারিবারিক জীবনও দীর্ঘদিন ধরে নরওয়ের মানুষের আলোচনার বিষয়। ১৯৯৯ সালে দেশে ফেরার পর তাঁর সঙ্গে মেতে-মারিতের পরিচয় হয়। ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড শহরের একটি সংগীত উৎসবে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল। সাধারণ সামাজিক পটভূমি থেকে উঠে আসা মেতে-মারিতের সঙ্গে তৎকালীন যুবরাজ হাকনের সম্পর্ক শুরু থেকেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

২০০১ সালে তাদের বিয়ের আগে নরওয়েতে এই সম্পর্ক নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়েছিল। রক্ষণশীল মহলের একটি অংশ প্রশ্ন তুলেছিল, সাধারণ পরিবার থেকে আসা এবং পূর্ববর্তী জীবনে নানা বিতর্কে আলোচিত একজন নারী ভবিষ্যৎ রাজার স্ত্রী হওয়ার জন্য উপযুক্ত কি না। তবে হাকন প্রকাশ্যে নিজের সম্পর্কের প্রতি দৃঢ় অবস্থান নেন।

বিয়ের আগে এক আবেগঘন সাক্ষাৎকারে মেতে-মারিত তাঁর অতীতের কিছু বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ধীরে ধীরে নরওয়ের মানুষের ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেন। পরে তাঁকে আধুনিক নরওয়েজীয় রাজতন্ত্রের পরিবর্তনশীল চরিত্রের অন্যতম প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়।

হাকন ও মেতে-মারিতের দুই সন্তান রয়েছে। তাঁদের মেয়ে ইনগ্রিড আলেকজান্দ্রা বর্তমানে যুবরানি এবং নরওয়ের সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী। ১৯৯০ সালে নরওয়ের সংবিধানে পরিবর্তনের মাধ্যমে নারী সন্তানদের উত্তরাধিকার অধিকারের বিষয়টি আরও সুস্পষ্ট করা হয়। এর ফলে ভবিষ্যতে ইনগ্রিড আলেকজান্দ্রার রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।

তবে এমন এক সময়ে হাকন সিংহাসনে বসেছেন, যখন রাজপরিবারকে ঘিরে একাধিক বিতর্ক জনসমক্ষে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাঁর স্ত্রী মেতে-মারিতকে নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে অতীতে যোগাযোগের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর তিনি ক্ষমা চান এবং নিজের বিচারবোধ নিয়ে ভুল হয়েছিল বলে স্বীকার করেন।

এ ছাড়া মেতে-মারিতের আগের সম্পর্কের ছেলে মারিয়ুস বর্গ হইবিকে ঘিরেও রাজপরিবার ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছে। বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের মামলায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে আলোচনায় এসেছে। যদিও তিনি রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক সদস্য নন, দীর্ঘদিন রাজপরিবারের সঙ্গে বড় হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি রাজপরিবারের ভাবমূর্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।

এর মধ্যেই মেতে-মারিতের শারীরিক অসুস্থতা হাকনের ব্যক্তিগত জীবনে আরও বড় চাপ তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের জটিলতায় ভোগার পর তাঁর চিকিৎসা চলছে। ফলে নতুন রাজাকে একই সময়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব, রাজপরিবারের ভাবমূর্তি এবং অসুস্থ স্ত্রীকে সমর্থন দেওয়ার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, হাকনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাঁর দীর্ঘ প্রস্তুতি এবং দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা। তিনি হঠাৎ করে সিংহাসনে আসা কোনো অপ্রস্তুত ব্যক্তি নন। বহু বছর ধরে রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে করতে তিনি রাষ্ট্রীয় কাঠামো, জনজীবন এবং রাজতন্ত্রের আধুনিক ভূমিকা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।

তবে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে মানুষের আস্থা ধরে রাখা। রাজা হ্যারাল্ড দীর্ঘ সময় ধরে যে জনপ্রিয়তা তৈরি করেছিলেন, তা নতুন রাজার জন্য একই সঙ্গে আশীর্বাদ এবং চ্যালেঞ্জ। একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশে রাজতন্ত্রের অস্তিত্ব অনেকটাই নির্ভর করে জনগণের গ্রহণযোগ্যতা ও আস্থার ওপর। তাই হাকন কীভাবে বিতর্কগুলো সামলান এবং রাজপরিবারকে আরও স্বচ্ছ ও জনসম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন, সেটিই তাঁর রাজত্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

নরওয়ের মানুষের সামনে এখন একটি নতুন রাজত্বের শুরু। একদিকে বাবার রেখে যাওয়া জনপ্রিয়তার উত্তরাধিকার, অন্যদিকে পরিবারকে ঘিরে বিতর্ক এবং ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন বাস্তবতা—সব মিলিয়ে হাকনের পথ সহজ নয়। তবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, সংযত ব্যক্তিত্ব এবং দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি তাঁকে এই নতুন অধ্যায়ের জন্য শক্ত ভিত দিয়েছে।

সময়ের সঙ্গে হাকন কেবল তাঁর বাবার উত্তরসূরি হিসেবে নয়, নিজের পরিচয়ে একজন রাজা হিসেবে নরওয়ের মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেন কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কঠিন সময়ের মধ্যেই তাঁর রাজত্ব শুরু হয়েছে, আর সেই কঠিন সময়কে কীভাবে তিনি সুযোগে পরিণত করেন, তার ওপর নির্ভর করতে পারে নরওয়ের রাজতন্ত্রের আগামী দিনের পথচলা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত