রানা প্লাজা দুর্নীতি মামলায় সোহেল রানাসহ ৮ জনের রায় আজ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১ বার
রানা প্লাজা দুর্নীতি মামলায় সোহেল রানাসহ ৮ জনের রায় আজ

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সাভারের রানা প্লাজা ভবন নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলায় ভবনটির মালিক সোহেল রানাসহ আট আসামির বিরুদ্ধে আজ মঙ্গলবার রায় ঘোষণা করার কথা রয়েছে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালত এ মামলার রায় দেবেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ শিল্পদুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ভবনটির নির্মাণ ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তিকে ঘিরে নতুন করে জনমনে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক বি এম তারিকুল কবীর মামলাটির রায় ঘোষণা করবেন বলে জানা গেছে। এর আগে গত ১৬ আগস্ট রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রায় প্রস্তুত না হওয়ায় আদালত রায় ঘোষণার তারিখ পরিবর্তন করে ১ সেপ্টেম্বর নতুন দিন ধার্য করেন।

এই মামলায় প্রধান আসামি হিসেবে রয়েছেন রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা। তার সঙ্গে অভিযুক্ত অন্যদের মধ্যে রয়েছেন সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র রেফাত উল্লাহ, সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায়, নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান রাসেল, সাবেক টাউন প্ল্যানার ফারজানা ইসলাম এবং লাইসেন্স পরিদর্শক মো. আবদুল মোত্তালিব।

সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, সোহেল রানা এ দুর্নীতি মামলায় জামিনে থাকলেও রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। রায় ঘোষণার সময় তাকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে। মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে মাহবুবুর রহমান ও ফারজানা ইসলাম পলাতক রয়েছেন বলে জানা গেছে। জামিনে থাকা অন্য আসামিদেরও আদালতে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিলের সেই ভয়াবহ সকাল এখনো বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিতে গভীর ক্ষত হয়ে আছে। সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকার রানা প্লাজা ভবনটি কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে। ভবনের ভেতরে থাকা হাজারো মানুষ তখন বুঝে ওঠার আগেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন। ভয়াবহ এ ঘটনায় এক হাজার ১৩৬ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিক।

হাজারো পরিবার সেই দুর্ঘটনায় হারিয়েছিল তাদের উপার্জনক্ষম সদস্যকে। কেউ হারিয়েছিলেন সন্তান, কেউ স্বামী, কেউ বাবা কিংবা পরিবারের একমাত্র ভরসার মানুষকে। বহু মানুষ গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে জীবন কাটিয়েছেন। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ইতিহাসে রানা প্লাজা ধস শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, ভবন নির্মাণের মান এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছিল।

ভবন ধসের পর তদন্তে রানা প্লাজার নির্মাণ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে আসে। ভবনটির নকশা অনুমোদন, কাঠামোগত পরিবর্তন, অনুমোদনের বাইরে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ এবং ভবনের ব্যবহার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে একটি শপিং কমপ্লেক্স হিসেবে অনুমোদন পাওয়া ভবনে পরবর্তী সময়ে একাধিক পোশাক কারখানা পরিচালনার অনুমতি দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।

এসব অভিযোগের পর দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত শুরু করে। তদন্ত শেষে ভবন নির্মাণে নকশাবহির্ভূত কাজ এবং বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগে ২০১৪ সালের ১৫ জুন সাভার থানায় মামলা করা হয়। মামলার শুরুতে মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলেও তখন সোহেল রানাকে আসামি করা হয়নি। কারণ, ভবনটি তার বাবা আবদুল খালেকের নামে ছিল।

তবে পরবর্তী তদন্তে ভবনটির নির্মাণ, অনুমোদন এবং ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয়ে সোহেল রানার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায় বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য। এরপর অধিকতর তদন্ত শেষে তাকে মামলায় আসামি করা হয়। ২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি অধিকতর তদন্ত শেষে সোহেল রানা, তার বাবা-মাসহ মোট ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

পরবর্তী সময়ে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় কয়েকজন আসামিকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অভিযোগ গঠনের সময় আটজনকে মামলা থেকে বাদ দেওয়ার পর ১০ আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়। বিচার চলাকালে সোহেল রানার বাবা আবদুল খালেক এবং মা মর্জিনা খাতুন বেগম মারা যান। তাদের মৃত্যুর পর আদালত তাদের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রমের অবসান ঘটান। ফলে শেষ পর্যন্ত আট আসামির বিরুদ্ধে মামলাটির বিচার সম্পন্ন হয়েছে।

মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ‘রানা প্লাজা’ নামে ছয়তলা একটি শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য ২০০৬ সালের ১০ এপ্রিল সাভার পৌরসভা থেকে নকশা অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল। পরে ২০০৮ সালের ২২ জানুয়ারি ভবনের ওপর আরও চারটি তলা নির্মাণের অনুমোদন চাওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, মূল অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

তদন্তে আরও অভিযোগ ওঠে, যে ভবনটি মূলত বাণিজ্যিক শপিং কমপ্লেক্স হিসেবে নির্মাণের অনুমোদন পেয়েছিল, সেখানে পরবর্তী সময়ে পাঁচটি পোশাক কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। ভবনের নকশা, অতিরিক্ত তলা নির্মাণ এবং কারখানা পরিচালনার অনুমোদনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়ে মামলায় প্রশ্ন তোলা হয়।

এই মামলার মূল গুরুত্ব এখানেই যে, এটি শুধু একটি ভবন ধসের ঘটনায় দায় নির্ধারণের বিষয় নয়; বরং একটি বড় নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, দায়িত্বশীলতা এবং সম্ভাব্য দুর্নীতির অভিযোগও বিচারিকভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। একটি ভবন কীভাবে অনুমোদন পেল, কীভাবে তার কাঠামো পরিবর্তন হলো এবং কীভাবে সেখানে শিল্পকারখানা পরিচালনার সুযোগ তৈরি হলো—এসব প্রশ্নের সঙ্গে মামলাটির অভিযোগগুলো সরাসরি সম্পর্কিত।

২০১৭ সালের ২১ মে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ ২০ জন সাক্ষী উপস্থাপনের অনুমতি পেয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৯ জন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর মামলাটি রায় ঘোষণার পর্যায়ে পৌঁছায়।

রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় একাধিক মামলা দায়ের হয়েছিল। এর মধ্যে ভবন নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ, এখানে ভবনের মালিকানা বা ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি অনুমোদন প্রদানকারী এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তির ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ আনা হয়েছে।

দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে চলা এ মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছাতে যাচ্ছে। রায় ঘোষণার মাধ্যমে অভিযোগগুলোর বিচারিক নিষ্পত্তি হবে এবং আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে আদালতের অবস্থান স্পষ্ট হবে। রায়ের দিকে তাকিয়ে আছেন নিহত ও আহতদের স্বজনরাও, যাদের কাছে রানা প্লাজার নাম আজও বেদনা, ক্ষতি এবং অপূরণীয় শূন্যতার প্রতীক।

বাংলাদেশের শিল্পখাত ও নির্মাণ নিরাপত্তার ইতিহাসে রানা প্লাজা ধস একটি বড় মোড় পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই ঘটনার পর কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, ভবনের কাঠামোগত মান, শিল্পকারখানা পরিচালনার অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছিল।

আজকের রায় সেই দীর্ঘ আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে যাচ্ছে। আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ভবন নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের আইনি পরিণতি নির্ধারিত হবে। একই সঙ্গে বহু বছর ধরে বিচারিক প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় থাকা একটি আলোচিত মামলার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত