বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার যুক্তরাষ্ট্রের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১ বার
বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার যুক্তরাষ্ট্রের

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসী ভিসা ইস্যুর ওপর আরোপ করা স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়া হয়েছে। দেশটির একটি ফেডারেল আদালতের রায়ের পর গত ২১ আগস্ট থেকে ওই স্থগিতাদেশ আর কার্যকর নেই। ফলে তালিকাভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা ইস্যুর ক্ষেত্রে আগের সেই বাধা আর থাকছে না। তবে ভিসা পেতে আবেদনকারীদের যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত অভিবাসন আইন ও ভিসা প্রক্রিয়ার সব শর্ত পূরণ করতে হবে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ২৮ আগস্ট হালনাগাদ করা তথ্যেও স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন দেখা বাংলাদেশিসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আবেদনকারীদের জন্য এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে যাদের আবেদন প্রক্রিয়া স্থগিতাদেশের কারণে অনিশ্চয়তায় পড়েছিল, তাদের জন্য এটি নতুন করে আশার সুযোগ তৈরি করেছে।

অভিবাসী ভিসার মাধ্যমে একজন বিদেশি নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেতে পারেন। পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে গ্রিন কার্ড পাওয়ার পথও উন্মুক্ত হয়। ফলে অভিবাসী ভিসা বন্ধ বা স্থগিত হওয়ার মতো সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পরিবার, স্বজন এবং দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন পরিকল্পনার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে স্থগিত করে। ওই সময় মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তালিকাভুক্ত কিছু দেশের আবেদনকারীরা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন। এ কারণে তাদের আবেদন আরও সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করা হয়েছিল।

এই অতিরিক্ত যাচাই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ভিসা ইস্যু স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে আবেদনকারীদের নতুন আবেদন জমা দেওয়া কিংবা নির্ধারিত সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়ার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। অর্থাৎ স্থগিতাদেশটি মূলত আবেদন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে ভিসা ইস্যুর ওপর প্রভাব ফেলেছিল।

ফলে অনেক আবেদনকারী সাক্ষাৎকারসহ প্রয়োজনীয় ধাপ সম্পন্ন করেও ভিসা হাতে পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। তাদের জন্য স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এখন সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে ভিসা ইস্যুর প্রক্রিয়া পুনরায় এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে স্থগিতাদেশ উঠে যাওয়াকে সরাসরি ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আবেদনকারীদের আগের মতোই যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনের আওতায় নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আর্থিক সক্ষমতা, পারিবারিক সম্পর্ক, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত যাচাইসহ প্রযোজ্য সব শর্ত পূরণ করতে হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাইয়ের ওপর নির্ভর করবে।

স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জও এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নীতিটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা করে ক্যাথলিক লিগ্যাল ইমিগ্রেশন নেটওয়ার্ক। মামলায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে বিবাদী করা হয়।

নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের ফেডারেল আদালতে মামলাটির শুনানি হয়। বিচারক জেনেট ভার্গাসের দেওয়া রায়ে বলা হয়, কেবল কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাগরিক হওয়ার কারণে অভিবাসী ভিসা আটকে রাখার সিদ্ধান্ত অভিবাসন ও জাতীয়তা আইনের অধীনে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর ২১ আগস্ট থেকে ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা ইস্যুর ওপর আগের স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকার সুযোগ আর থাকেনি। পরবর্তী সময়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে তথ্য হালনাগাদ করে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়।

বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্যও এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বাংলাদেশি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসী ভিসার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকে। স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা কিংবা অন্যান্য যোগ্য পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে অনেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। ভিসা ইস্যু স্থগিত থাকায় এসব পরিবারের অনেকের পরিকল্পনা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছিল।

স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের ফলে সেই অনিশ্চয়তা কিছুটা কমেছে। তবে আবেদনকারীদের এখন ধৈর্যের সঙ্গে পরবর্তী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। কোনো আবেদন আগে থেকেই প্রক্রিয়াধীন থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ধাপ সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে ভিসা ইস্যুর ক্ষেত্রে নতুন কোনো প্রশাসনিক নির্দেশনা বা অতিরিক্ত যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে সেটিও মেনে চলতে হবে।

এই স্থগিতাদেশের আওতায় বাংলাদেশ ছাড়াও এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ ছিল। তালিকায় আফগানিস্তান, আলবেনিয়া, আলজেরিয়া, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহামাস, বারবাডোস, বেলারুশ, বেলিজ, ভুটান, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, ব্রাজিল, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, ক্যামেরুন, কলম্বিয়া, কিউবা, মিসর, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, জর্জিয়া, ঘানা, গুয়াতেমালা, হাইতি, ইরান, ইরাক, জ্যামাইকা, জর্ডান, কাজাখস্তান, কুয়েত, লেবানন, লিবিয়া, মরক্কো, নেপাল, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, রাশিয়া, রুয়ান্ডা, সেনেগাল, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়া, তানজানিয়া, থাইল্যান্ড, উগান্ডা, উজবেকিস্তান ও ইয়েমেনসহ বিভিন্ন দেশের নাম ছিল।

এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরিবর্তন সামনে এসেছে। আদালতের রায়ের ফলে নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ভিসা ইস্যু স্থগিত রাখার নীতির কার্যকারিতা শেষ হয়েছে। তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নিরাপত্তা ও যোগ্যতা যাচাই অব্যাহত থাকবে।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, অভিবাসী ভিসার ক্ষেত্রে নীতিগত পরিবর্তন শুধু একজন আবেদনকারীর ওপর নয়, পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর প্রভাব ফেলে। কেউ যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নতুন কর্মজীবন শুরু করতে চান, কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন দেখেন, আবার কারও দীর্ঘদিনের অপেক্ষা নির্ভর করে একটি ভিসা সিদ্ধান্তের ওপর। তাই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের খবর অনেক আবেদনকারীর জন্য বাস্তব ও মানবিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে আদালতের রায় এবং স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের অর্থ এই নয় যে তালিকাভুক্ত ৭৫ দেশের সব আবেদনকারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা পাবেন। প্রত্যেক আবেদনকারীর যোগ্যতা আলাদাভাবে যাচাই করা হবে। সংশ্লিষ্ট আইন ও নিয়ম অনুযায়ী আবেদনকারীর ভিসা পাওয়ার যোগ্যতা নিশ্চিত হওয়ার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। তাই স্থগিতাদেশ উঠে যাওয়ার পর নতুন পরিস্থিতিতে আবেদনকারীদের নিজ নিজ আবেদনসংক্রান্ত নির্দেশনা সতর্কতার সঙ্গে অনুসরণ করা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ভিসা প্রক্রিয়া আবার স্বাভাবিক ধারায় ফিরবে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে প্রতিটি আবেদন সম্পন্ন হতে কত সময় লাগবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কেসের ধরন ও যাচাই প্রক্রিয়ার ওপর।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা ইস্যুর ওপর স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রত্যাশী বহু মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। আদালতের রায়ের মাধ্যমে নীতিগত বাধা সরে গেলেও আবেদনকারীদের জন্য পরবর্তী চ্যালেঞ্জ থাকবে নির্ধারিত সব শর্ত পূরণ করে চূড়ান্ত ভিসা অনুমোদন পাওয়া। এখন সংশ্লিষ্টদের নজর থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের পরবর্তী কার্যক্রম ও আবেদন নিষ্পত্তির গতির দিকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত