রিজার্ভ চুরির মামলায় মার্কিন আইন প্রতিষ্ঠানের চুক্তি বাতিল

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১ বার

প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে চলমান মামলায় নিয়োজিত মার্কিন আইনি প্রতিষ্ঠান কোজেন ও’কনরের সঙ্গে আইনি সহায়তা চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে মামলার আইনি কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না। অন্য তিনটি আইনি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে মামলা পরিচালনায় সহায়তা অব্যাহত রাখবে।

রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড সভায় সদস্যদের সম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। একই সভায় কোজেন ও’কনরকে এর আগে দেওয়া আইনি সেবার বিল পরিশোধের বিষয়টিও অনুমোদন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে দায়ের করা রিজার্ভ চুরির মামলায় কোজেন ও’কনরকে আর প্রয়োজনীয় মনে না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। তবে মামলাটি পরিচালনায় মার্কিন আইনি প্রতিষ্ঠান ব্রাউন, নেরি, স্মিথ অ্যান্ড খান এলএলপি (বিএনএসকে), বাংলাদেশের এসআইএ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস এবং যুক্তরাজ্যের কিস্টোন ল নিয়োজিত থাকবে।

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে হ্যাকাররা প্রায় ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করে। সাইবার হামলার মাধ্যমে পাঠানো ওই অর্থের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের কয়েকটি ব্যাংক হিসাবে চলে যায়। আরও ২ কোটি ডলার পাঠানো হয় শ্রীলঙ্কায়।

তবে শ্রীলঙ্কায় পাঠানো অর্থের একটি অংশ লেনদেনের তথ্যের বানান ভুলের কারণে আটকে যায়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে চুরি যাওয়া অর্থের একটি অংশ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। কিন্তু চুরি হওয়া অর্থের বড় অংশ এখনো ফেরত পাওয়া যায়নি।

অর্থ উদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্রে আইনি পদক্ষেপ

চুরি যাওয়া অর্থের বড় অংশ উদ্ধারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে আইনি পদক্ষেপ নেয়। ওই মামলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে আইনি সহায়তা দিয়ে আসছিল কোজেন ও’কনর।

সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি বাতিল হলেও যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে চলমান আইনি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। বিএনএসকে ও কিস্টোন ল বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে মামলাটি পরিচালনায় সহায়তা করবে। ফলে একটি আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি শেষ হলেও রিজার্ভ চুরির অর্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা থেমে যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা শাখার (বিএফআইইউ) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কোজেন ও’কনর রিজার্ভ চুরির মামলায় বাংলাদেশ ব্যাংককে ঐচ্ছিক আইনি সহায়তা দিচ্ছিল। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সহায়তা আগের মতো জরুরি না হওয়ায় চুক্তি বাতিল করা হয়েছে।

তিনি বলেন, অন্য আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো মামলার কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।

মামলা নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারে বাংলাদেশ পুরো অর্থ সুদসহ ফেরত পাওয়ার দাবি নিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, প্রতিপক্ষের একটি গোষ্ঠী চুরি হওয়া অর্থের অর্ধেক দিয়ে বিষয়টি নিষ্পত্তির প্রস্তাব দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই প্রস্তাবে রাজি হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান হলো, চুরি যাওয়া অর্থের পুরোটা সুদসহ উদ্ধার করা। এ কারণে মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অর্ধেক অর্থ গ্রহণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় দীর্ঘ আইনি লড়াই

২০১৬ সালের ওই সাইবার চুরি বিশ্বের অন্যতম আলোচিত কেন্দ্রীয় ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট অর্থ চুরির ঘটনা হিসেবে পরিচিত। নিউইয়র্ক ফেডে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে রাখা অর্থ থেকে জালিয়াতিপূর্ণ নির্দেশনার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তর করা হয়।

চুরির পর ফিলিপাইনে যাওয়া অর্থের একটি বড় অংশ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়ে শেষ পর্যন্ত দেশটির ক্যাসিনো-সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ঢুকে পড়ে বলে তদন্তে উঠে আসে। এর একটি অংশ পরে উদ্ধার করা হলেও পুরো অর্থ ফেরত পাওয়া যায়নি।

এই অর্থ উদ্ধারে বাংলাদেশ একদিকে ফিলিপাইনসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা আইনি প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন মার্কিন ও আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংককে সহায়তা করেছে।

কোজেন ও’কনরের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত তাই মামলার সমাপ্তি নয়; বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনি প্রতিনিধিত্বের কাঠামোয় পরিবর্তন। বর্তমানে দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আশা, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চুরি যাওয়া অর্থের বড় অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হবে। তবে অর্থ ফেরতের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিরুদ্ধে চলমান আইনি পদক্ষেপের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত