সিন্ধু চুক্তি মানতেই হবে ভারতকে, রায় আন্তর্জাতিক আদালতের

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার

প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত করলেও এর আওতাভুক্ত পানি বণ্টন ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসংক্রান্ত বিধান ভারতকে মেনে চলতে হবে বলে রায় দিয়েছে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগভিত্তিক পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন বা স্থায়ী সালিশি আদালত। একই সঙ্গে কাশ্মীর অঞ্চলে নির্মাণাধীন একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সীমিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তথাকথিত এই সালিশি আদালতের রায় দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই এবং ভারত এর সিদ্ধান্ত মানে না।

সোমবার দেওয়া রায়ে স্থায়ী সালিশি আদালত বলেছে, দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং ভারত কর্তৃক চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা সত্ত্বেও সিন্ধু পানি চুক্তির বিধান কার্যকর রয়েছে। চুক্তির আওতায় পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভারতের ওপর যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেগুলোও বহাল থাকবে।

আদালত বিশেষভাবে জানিয়েছে, পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর ওপর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নকশা ও পরিচালনাসহ চুক্তির আওতাধীন সব বাধ্যবাধকতা ভারতকে মেনে চলতে হবে।

সিন্ধু পানি চুক্তি ১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় করা এই চুক্তির অধীনে সিন্ধু নদী ব্যবস্থার পূর্বাঞ্চলীয় নদীগুলোর ওপর ভারতের এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর ওপর পাকিস্তানের অধিকারের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে বৈরিতা, এমনকি একাধিক যুদ্ধ ও সামরিক সংঘাত চললেও চুক্তিটি বহাল ছিল।

তবে গত বছর কাশ্মীরের একটি পর্যটনকেন্দ্রে ভয়াবহ হামলার পর পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন ঘটে। ওই হামলায় ২৬ জন নিহত হন। ভারত হামলায় জড়িত তিন হামলাকারীর মধ্যে দুজনকে পাকিস্তানি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করার দাবি করে। পাকিস্তান অবশ্য হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে।

হামলার পর ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। নয়াদিল্লির এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ইসলামাবাদ তীব্র আপত্তি জানায়। পাকিস্তানের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষিজমিতে সেচের পানি সরবরাহের সঙ্গে সিন্ধু নদী ব্যবস্থা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত।

চুক্তি স্থগিতের পাশাপাশি ভারত কাশ্মীর অঞ্চলে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে কাজ এগিয়ে নেয়। পাকিস্তানের অভিযোগ, এসব প্রকল্পে জলাধারের ধারণক্ষমতা বাড়ানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারত চুক্তির সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান আইনি পদক্ষেপ নেয়। কাশ্মীর অঞ্চলের দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিষয়ে ভারতের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে দেশটি আন্তর্জাতিক সালিশি ব্যবস্থার দ্বারস্থ হয়।

স্থায়ী সালিশি আদালতের রায়ে পাকিস্তানের দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থান উঠে এসেছে। আদালত জানিয়েছে, সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো কার্যকর এবং এটি বাতিল বা স্থগিত করার ক্ষেত্রে ভারতের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

আদালত আরও জানিয়েছে, বিশ্বব্যাংকের নিয়োগ দেওয়া একজন নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে হিমালয় অঞ্চলে ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর নির্মাণকাজ চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নির্ধারণ করবেন।

রায়ে রাটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়েও নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের দাবির সঙ্গে একমত হয়ে আদালত জানিয়েছে, নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের সিদ্ধান্তের পরবর্তী ৯০ দিন পর্যন্ত প্রকল্পটির বাঁধের দেয়াল ও পানি প্রবেশের কাঠামো নির্ধারিত উচ্চতার বেশি নির্মাণ করা যাবে না।

আদালতের সিদ্ধান্তের পর ভারতের অবস্থানও দ্রুত পরিষ্কার হয়ে যায়। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, সালিশি আদালত গঠনের প্রক্রিয়াই সিন্ধু পানি চুক্তির গুরুতর লঙ্ঘন করেছে।

ভারতের দাবি, বিশ্বব্যাংক চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে এই তথাকথিত সালিশি আদালত গঠন করেছে। ফলে নয়াদিল্লি আদালতের দেওয়া রায় দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, তারা এই সালিশি সংস্থার আইনগত অস্তিত্ব কখনো স্বীকার করেনি। এ কারণেই ভারত আদালতের কার্যক্রমে অংশ নেয়নি এবং এর আগের সিদ্ধান্তগুলোকেও আমলে নেয়নি।

নয়াদিল্লির এই অবস্থানের ফলে রায়টি বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একদিকে আদালত চুক্তির বাধ্যবাধকতা বহাল থাকার কথা বলেছে, অন্যদিকে ভারত আদালতের এখতিয়ারই অস্বীকার করছে। ফলে সিন্ধু পানি চুক্তিকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তান বিরোধ আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সিন্ধু পানি চুক্তি দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ১৯৬০ সালে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তিনটি বড় যুদ্ধ এবং একাধিক সামরিক সংঘাত হয়েছে। কিন্তু এসব সংঘাতের মধ্যেও পানি বণ্টনসংক্রান্ত কাঠামোটি কার্যকর ছিল।

গত বছরের কাশ্মীর হামলার পর চুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্ত সেই দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, সিন্ধু অববাহিকার পানির ওপর তাদের কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতি ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে ভারতের একতরফা পদক্ষেপকে ইসলামাবাদ অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে দেখছে।

অন্যদিকে ভারত নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের অভিযোগের সঙ্গে পানি চুক্তির বিষয়টিকে যুক্ত করেছে। কাশ্মীর হামলার পর নয়াদিল্লির নেওয়া পদক্ষেপগুলো ছিল পাকিস্তানের ওপর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর বৃহত্তর কৌশলের অংশ।

সাম্প্রতিক রায় সেই বিরোধকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আদালত একদিকে চুক্তির আইনগত ধারাবাহিকতা তুলে ধরেছে, অন্যদিকে ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প পরিচালনার ওপরও নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছে।

তবে ভারত যেহেতু আদালতের কার্যক্রমে অংশ নেয়নি এবং রায়কে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে, তাই এর পরবর্তী বাস্তব প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে দুই দেশের কূটনৈতিক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টির অগ্রগতির ওপর।

সিন্ধু নদী ব্যবস্থাকে ঘিরে ভারত ও পাকিস্তানের বিরোধ কেবল পানি ব্যবহারের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে কৃষি, জ্বালানি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিও সরাসরি যুক্ত। ফলে আদালতের এই রায় দুই প্রতিবেশী দেশের দীর্ঘদিনের পানি বিরোধে গুরুত্বপূর্ণ একটি নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত