প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের আগে কার্যকর কূটনৈতিক প্রস্তুতি, জাতীয় ঐকমত্য এবং সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং স্বাধীন কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি।
সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ আয়োজিত ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান: কৌশলগত জাতীয় নিরাপত্তার হিসাব-নিকাশ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
আলোচনায় মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বলেন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতা বাড়ানো প্রয়োজন। দ্রুত সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি কঠিন হওয়ায় সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো বন্ধুভাবাপন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, যৌথ প্রশিক্ষণ এবং সামরিক প্রযুক্তি বিনিময়ের সুযোগ কাজে লাগানো যেতে পারে।
তিনি বলেন, তুরস্কের সামরিক সক্ষমতা থেকে বাংলাদেশ উপকৃত হতে পারে। একই সঙ্গে দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও জোর দিতে হবে। তাঁর মতে, মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী সতর্ক করে বলেন, যেকোনো আন্তর্জাতিক জোটে যোগ দেওয়ার আগে পূর্ণাঙ্গ ‘কস্ট-বেনিফিট অ্যানালিসিস’ করা প্রয়োজন। জনমতের আবেগে ভেসে মক্কা চুক্তিকে নিরাপত্তার ‘শর্টকাট সমাধান’ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
তিনি বলেন, ১৯৭২ সাল থেকে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সেনাবাহিনীকে দুর্বল রাখার একটি প্রবণতা রয়েছে। এই বাস্তবতা পরিবর্তন না করে শুধু একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিয়ে দেশের সব নিরাপত্তা সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের পূর্বের তিক্ত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন জোটের সম্ভাব্য ঝুঁকিও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসান নাসির বলেন, বিপদের সময় পাশে থাকবে—এমন বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন। পাকিস্তানসহ যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্য রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার চেয়ে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
তবে তাঁর মতে, মক্কা চুক্তি যেন শেষ পর্যন্ত বড় কোনো অকার্যকর কাঠামোয় পরিণত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। একটি জোটে যুক্ত হওয়ার আগে সেটির বাস্তব সক্ষমতা, কার্যকারিতা এবং সদস্যদের পারস্পরিক প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রয়োগ কতটা সম্ভব—এসব বিষয় পর্যালোচনা করা জরুরি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য সামরিক ও কূটনৈতিক—দুই ধরনের সুযোগই রয়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথভাবে আকাশ প্রতিরক্ষা এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের মতো প্রযুক্তি উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে তিনি মনে করেন, এই সম্ভাবনাগুলো বাস্তবে কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা বাংলাদেশের কূটনৈতিক দক্ষতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণ মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন এফ. ড্যানিলোভিচ মক্কা চুক্তিকে একটি ‘প্রতিরক্ষামূলক জোট’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ন্যাটোর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, কোনো সদস্য আক্রান্ত হলেই জোটের অন্য সদস্যরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে—বিষয়টি এমন নয়। আক্রান্ত দেশ সহায়তা চাইলে অন্য সদস্যরা আলোচনার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
তাঁর মতে, মক্কা চুক্তির ক্ষেত্রেও সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ থাকবে। ফলে চুক্তিতে যোগ দেওয়ার অর্থ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বা সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলা নয়। তবে চুক্তির নির্দিষ্ট ধারা ও বাস্তব প্রয়োগের বিষয়গুলো ভালোভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
আলোচনায় বক্তারা একমত হন যে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের সিদ্ধান্ত কেবল সামরিক বিবেচনায় নেওয়া উচিত নয়। এর সঙ্গে কূটনীতি, অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার মতো বিষয়ও যুক্ত।
তাঁদের মতে, চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আগে সম্ভাব্য সুবিধা ও ঝুঁকি নিয়ে একটি সমন্বিত মূল্যায়ন করা দরকার। পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা ও ঐকমত্য তৈরি করে একটি সুসংগঠিত নিরাপত্তা কাঠামোর মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়াই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।