ভিয়েতনাম ছেড়ে বাংলাদেশে, ৭০ দেশে যাচ্ছে জুতা

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৭ বার

প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

২০০৭ সালের আগস্টে ভিয়েতনামে ব্যবসা শুরু করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন ইউক্রেনের এক বাবা ও ছেলে। কিন্তু বাংলাদেশে অল্প সময়ের যাত্রাবিরতিই বদলে দেয় তাঁদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা। প্রায় দুই দশক পর সেই সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে নারায়ণগঞ্জের আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটি এখন বিশ্বের ৬০ থেকে ৭০টি দেশে সামরিক বুট, নিরাপত্তা জুতা ও অন্যান্য বিশেষায়িত পণ্য রপ্তানি করছে।

ইউক্রেনের উদ্যোক্তা লাভরিক আন্দ্রিতি তখন বাবার সঙ্গে ভিয়েতনামে ব্যবসার সম্ভাবনা দেখতে যাচ্ছিলেন। বাংলাদেশে হোটেলে অবস্থানের সময় তিনি জানতে পারেন, দেশটির ট্যানারি ও চামড়া শিল্পের পাশাপাশি বিপুল জনসংখ্যা একটি বড় উৎপাদনভিত্তিক ব্যবসার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

হোটেলে পাওয়া ‘ইয়েলো পেজেস’-এর একটি কপিতে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) বিজ্ঞাপন দেখে তাঁরা বেপজার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেখানকার সহযোগিতা ও সম্ভাবনা দেখে ভিয়েতনামের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে বাংলাদেশেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন।

সেই সিদ্ধান্তের ফল হলো আদমজী ইপিজেডে ‘সুপার প্রোটেকটিভ শুজ (প্রাইভেট) লিমিটেড’। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলারের সামরিক বুট, নিরাপত্তা জুতা ও অন্যান্য বিশেষায়িত জুতা রপ্তানি করছে।

আদমজী থেকে ৭০ দেশের বাজারে

উৎপাদন শুরুর প্রায় দুই দশক পর সুপার প্রোটেকটিভ শুজ এখন বিশ্বের ৬০ থেকে ৭০টি দেশে পণ্য রপ্তানি করছে। ইউক্রেন, জার্মানি ও ইউরোপের অন্যান্য দেশ ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বাজারে প্রতিষ্ঠানটির পণ্য যাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটি মূলত সেফটি, ওয়ার্ক, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও সামরিক জুতা তৈরি করে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বুট, পিইউ পণ্য ও ইনসোল। মোট রপ্তানির প্রায় ১০ শতাংশ সামরিক জুতা, যার বড় অংশই ইউক্রেনের বাজারে যায়।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগ প্রায় ১৩ মিলিয়ন ডলার। প্রায় ১ হাজার মানুষ এখানে কাজ করছেন। অর্ডারের ওপর নির্ভর করে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার জোড়া জুতা উৎপাদন করা হয়।

প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক লাভরিক আন্দ্রিতির ভাষ্য অনুযায়ী, ইউক্রেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কার্যালয় রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতেও কার্যক্রম রয়েছে। জার্মানিতে একটি বড় গুদাম থেকে বিভিন্ন বাজারে পণ্য সরবরাহ করা হয়।

আগামী দুই বছরের মধ্যে বার্ষিক রপ্তানি ৫০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সেই লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশে আরও ১০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে।

প্রযুক্তির সঙ্গে শ্রমিকের দক্ষতা

আদমজী ইপিজেডের কারখানাটিতে উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি শ্রমিকদের দক্ষতাকে কাজে লাগানো হচ্ছে। কারখানায় চামড়া কাটার পর বিভিন্ন অংশ সেলাই, নকশার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া, সোল সংযোজন, ছাঁচ তৈরি, ফিনিশিং ও প্যাকেজিংয়ের মধ্য দিয়ে একটি জুতা প্রস্তুত হয়।

কারখানা পরিদর্শনের সময় উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে শ্রমিকদের আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে দেখা যায়। কোথাও চামড়া নির্দিষ্ট নকশা অনুযায়ী কাটা হচ্ছে, আবার কোথাও সেলাই ও সংযোজনের কাজ চলছে। উৎপাদন প্রক্রিয়ার কিছু অংশ কম্পিউটার স্ক্রিনের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণও করা হয়।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, জুতায় ব্যবহৃত অধিকাংশ চামড়া আসে ব্রাজিল, ইউক্রেন, ভারত ও তুরস্ক থেকে। কিছু চামড়া বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকেও সংগ্রহ করা হয়।

কারখানার কর্মীদের মধ্যে লিজা আক্তার জুতার নকশা অনুযায়ী চামড়া কাটার যন্ত্র পরিচালনা করেন। তাঁর মতে, কর্মস্থলে সুযোগ-সুবিধা ভালো এবং তিনি মাসে প্রায় ২৩ হাজার টাকা আয় করেন।

প্যাকেজিং বিভাগে কাজ করা নিয়ামত আলী ২০১৯ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা এই কর্মী জানান, বেতন ও কর্মপরিবেশ সন্তোষজনক হওয়ায় তিনি অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি খোঁজেননি।

হালকা ও টেকসই সেফটি জুতার প্রযুক্তি

বৈশ্বিক বাজারে সেফটি জুতার চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পণ্যের ওজন কমানোর পাশাপাশি স্থায়িত্ব ধরে রাখতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে প্রতিষ্ঠানটি।

আন্দ্রিতি বলেন, অত্যন্ত হালকা সেফটি জুতা তৈরির জন্য নতুন প্রযুক্তি আনা হচ্ছে। বাংলাদেশে এটি নতুন ধরনের প্রযুক্তি এবং বিশ্বেও এমন প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো সীমিত বলে জানান তিনি।

নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশেষ ধরনের আউটসোল তৈরি করা হচ্ছে। এতে জুতার ওজন কমবে, কিন্তু স্থায়িত্ব বজায় থাকবে। তরুণ ক্রেতাদের মধ্যে হালকা জুতার চাহিদা বাড়ছে উল্লেখ করে আন্দ্রিতি বলেন, বাংলাদেশ, ইউরোপ ও চীনেও এ ধরনের পণ্যের বাজার রয়েছে।

তাঁর মতে, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত জুতার ক্ষেত্রে শুধু ওজন কমানো যথেষ্ট নয়; দীর্ঘস্থায়িত্বও নিশ্চিত করতে হবে। তাই নতুন প্রযুক্তিতে এই দুই বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

উৎপাদন বাড়াতে ইউরোপ, তাইওয়ান ও চীন থেকে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। নতুন আরও কিছু যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ চলছে। এগুলো চালু হলে দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার জোড়ায় উন্নীত হবে। উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মীর সংখ্যাও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় অগ্রগতি

বাংলাদেশের জুতা শিল্পের সহায়ক অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ায় এখন কিছু উৎপাদন সরঞ্জাম ও উপকরণ স্থানীয়ভাবেও সংগ্রহ করতে পারছে সুপার প্রোটেকটিভ শুজ।

আন্দ্রিতির মতে, স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন সরঞ্জাম ও উৎপাদন উপকরণ তৈরি হওয়া তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা। এতে আমদানির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমিয়ে স্থানীয় উৎস থেকে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে।

আদমজী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে সহায়তা করছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে আদমজী ইপিজেডের ৪৭টি কারখানা ১.১৭৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। আরও ১০টি কারখানা বর্তমানে নির্মাণাধীন রয়েছে। এগুলো উৎপাদনে গেলে ইপিজেডটির বার্ষিক রপ্তানি ১.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে জানান তিনি।

বাড়ছে ব্যবসা, দেখা দিয়েছে জায়গার সংকট

উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়লেও সুপার প্রোটেকটিভ শুজের সামনে এখন নতুন একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে—কারখানা সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা পাওয়া।

আন্দ্রিতি জানান, ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য প্রতিষ্ঠানটি নতুন জায়গা খুঁজছে। কিন্তু আদমজী ইপিজেডে বর্তমানে খালি জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

তাঁর মতে, বেপজার মতো অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা রয়েছে এমন জমি বাংলাদেশে পাওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানটি আরও বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করবে।

প্রায় দুই দশক আগে ভিয়েতনামের উদ্দেশে যাত্রাপথে বাংলাদেশে করা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত যাত্রাবিরতি শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের বাবা-ছেলের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত সুপার প্রোটেকটিভ শুজ এখন বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির পরবর্তী লক্ষ্য আরও বিনিয়োগ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলারের বার্ষিক রপ্তানিতে পৌঁছানো।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত