প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রপ্তানিমুখী হিমায়িত খাদ্য খাতের উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়াতে ২ হাজার কোটি টাকার নতুন প্রাক-অর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই তহবিল থেকে রপ্তানিকারকেরা সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে এবং সর্বোচ্চ সাত বছর মেয়াদে ঋণ সুবিধা পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে গঠিত এই তহবিলের আওতায় দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ঋণ বিতরণের জন্য যোগ্য হবে। রোববার জারি করা এক সার্কুলারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ তথ্য জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি খাত দীর্ঘ ক্যাশ কনভার্সন সাইকেল, উচ্চ মজুত ব্যয়, কোল্ড-চেইন পরিচালনার বাড়তি খরচ এবং কম সুদে ঋণের সীমাবদ্ধতার মতো সমস্যার মুখোমুখি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে খাতটির সক্ষমতা বাড়ানো এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের লক্ষ্যেই নতুন তহবিল চালু করা হয়েছে।
নতুন কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে গ্রাহকেরা এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ সাত বছর মেয়াদে ঋণ পাবেন। এ ক্ষেত্রে একটি প্রকল্পের জন্য সর্বোচ্চ ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত মেয়াদি ঋণ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রকল্পে ঋণ ও মূলধনের অনুপাত সর্বোচ্চ ৭০:৩০ নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিদ্যমান কারখানা সংস্কার, সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের ক্ষেত্রেও ঋণ সুবিধা থাকবে। এসব প্রকল্পে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ পাঁচ বছর মেয়াদে সর্বোচ্চ ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত মেয়াদি ঋণ পাওয়া যাবে।
এ ছাড়া কাঁচামাল কেনা, কর্মীদের বেতন-ভাতা এবং ইউটিলিটি বিল পরিশোধের মতো ব্যয়ের জন্য সর্বোচ্চ ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত চলতি মূলধন ঋণ নেওয়া যাবে। এই ঋণের মেয়াদ হবে এক বছর। সন্তোষজনক লেনদেনের ভিত্তিতে তা সর্বোচ্চ একবার নবায়ন করা যাবে, ফলে মোট মেয়াদ দাঁড়াবে দুই বছর।
পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা উৎসাহিত করতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য অতিরিক্ত ঋণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সৌর প্যানেল স্থাপনে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা অথবা মূল প্রকল্পের ৩০ শতাংশ—যেটি কম—পরিমাণ ঋণ সুবিধা পাবে।
গ্রাহক পর্যায়ে এই তহবিলের ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ শতাংশ। তবে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাক-অর্থায়ন সুবিধা পাবে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে। ফলে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে তুলনামূলক কম খরচে রপ্তানিকারকদের অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
চলতি মূলধনের সংকটে যেসব হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে, তাদের এই তহবিল থেকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এর ফলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় কার্যক্রম শুরু করার সুযোগ পেতে পারে।
তবে ঋণখেলাপিরা এই সুবিধা পাবেন না। একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) অথবা রপ্তানি সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন তহবিল (ইএফপিএফ) থেকে একই খাতে অর্থায়ন নিচ্ছে, তারা নতুন তহবিলের আওতায় একই খাতে ঋণ পাওয়ার যোগ্য হবে না।
ঋণ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে পরিবেশ ও খাদ্য নিরাপত্তাসংক্রান্ত অনুমোদনও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কারখানাকে মৎস্য অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র থাকতে হবে।
তহবিলের আওতায় নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের একটি বিশেষ শর্তও আরোপ করা হয়েছে। সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী দুই বছরের মধ্যে তাদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ১৫ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।
কর্মীদের পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতেও যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। অর্থাৎ নতুন তহবিলের সুবিধা শুধু উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর জন্য নয়, বরং পরিবেশগত স্থায়িত্ব ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এসব বিশেষ শর্ত যথাযথভাবে পালন না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে এই তহবিল তো বটেই, বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্য কোনো তহবিল থেকেও ঋণ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য হবে।
হিমায়িত খাদ্য বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত। মাছ, চিংড়ি ও অন্যান্য হিমায়িত খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি এ খাতে উৎপাদন, সংরক্ষণ ও কোল্ড-চেইন অবকাঠামো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। নতুন এই তহবিলের মাধ্যমে কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়তে পারে।
বিশেষ করে উৎপাদন অবকাঠামো আধুনিকায়ন, নতুন কারখানা স্থাপন, চলতি মূলধনের সংকট দূর করা এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে খাতটির প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অঞ্চলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে হিমায়িত খাদ্য খাত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে আরও বড় অবদান রাখতে পারে।