স্থানীয় নির্বাচনে আলাদা প্রার্থী দেবে দলগুলো: গোলাম পরওয়ার

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪০ বার
স্থানীয় নির্বাচনে আলাদা প্রার্থী দেবে দলগুলো: গোলাম পরওয়ার

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্ভাব্য নির্বাচনী কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে যে রাজনৈতিক ঐক্য বা জোট কার্যকর ছিল, স্থানীয় নির্বাচনে তা একইভাবে বহাল থাকবে না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলগুলো নিজ নিজ প্রতীকে বা নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়ে আলাদা প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নেবে।

মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচনী বিধিমালা এবং স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন দাবির কথাও তুলে ধরেন।

গোলাম পরওয়ার বলেন, জাতীয় নির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্য ছিল। তবে স্থানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে সেই ঐক্য কার্যকর হবে না। দলগুলো নিজেদের মতো করে প্রার্থী দেবে। ফলে জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক সমীকরণ স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে সরাসরি প্রতিফলিত নাও হতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় ভিন্ন ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র তৈরি করে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশনের মতো স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি, স্থানীয় সাংগঠনিক ভিত্তি, সামাজিক যোগাযোগ এবং এলাকার মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে জাতীয় পর্যায়ে জোটবদ্ধ থাকা দলগুলো স্থানীয় পর্যায়ে আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের প্রতি তাদের আস্থার কথাও জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নির্বাচন বর্জনের মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। বরং দলের স্থানীয় পর্যায়ের সংগঠনগুলোকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।

এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে জামায়াতে ইসলামী স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। দলটির স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নির্বাচনী প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার অর্থ হচ্ছে সম্ভাব্য ভোটকে কেন্দ্র করে সাংগঠনিক তৎপরতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কোন কোন এলাকায় কারা প্রার্থী হবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য তিনি জানাননি।

নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে কমিশনের একজন অতিরিক্ত সচিবকে নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে জামায়াত। গোলাম পরওয়ার দাবি করেন, ওই কর্মকর্তাকে দায়িত্বে রেখে নির্বাচন আয়োজন করা হলে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তাঁর অভিযোগ, ওই অতিরিক্ত সচিব বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত এবং দলটিতে তাঁর পদ রয়েছে। এ কারণে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের অবস্থানও তুলে ধরেছেন গোলাম পরওয়ার। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কমিশন জানিয়েছে ওই কর্মকর্তাকে সরকার নিয়োগ দিয়েছে। ফলে নিয়োগ ও প্রশাসনিক দায়িত্বের বিষয়টি সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলেই কমিশন মনে করছে।

নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের প্রশ্ন ওঠে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরেও কমিশনের ওপর নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করার চাপ রয়েছে। বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা এবং সব প্রার্থীকে সমান সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াতের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সচিবকে সরানোর দাবি সেই আস্থার প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে।

বৈঠকে স্থানীয় নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে জামায়াত। গোলাম পরওয়ারের দাবি, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত সংবিধানবিরোধী। তিনি জানান, নির্বাচন কমিশনকে এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে।

এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্থানীয় পর্যায়ে তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও অনেক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। ফলে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না, এ প্রশ্নটি স্থানীয় রাজনীতিতে আগ্রহ তৈরি করতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত বিধান ও আইনি ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

জামায়াতের পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কোনো নেতা যাতে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, সেই বিষয়েও সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানান গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাছে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নটি বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল। কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলে সেই দলের নেতাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে কি না, তা নির্ধারণে আইন, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং নির্বাচন কমিশনের বিধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে জামায়াতের এ দাবির বাস্তবায়ন নির্ভর করবে বিদ্যমান আইন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর।

গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, জামায়াত এখনো নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থাশীল। তবে কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে দলটির কিছু আপত্তি রয়েছে। এসব বিষয়ে সমাধান হলে নির্বাচনী পরিবেশ আরও গ্রহণযোগ্য হবে বলে তারা মনে করছে।

এদিকে স্থানীয় নির্বাচনে আলাদা প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠপর্যায়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। জাতীয় নির্বাচনে কোনো কোনো দল আসন সমঝোতা বা জোটগত কৌশল গ্রহণ করলেও স্থানীয় নির্বাচনে একই ধরনের সমঝোতা না থাকলে ভোটের মাঠে প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে ভোটারদের সামনে একাধিক রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দলগুলোর স্থানীয় সাংগঠনিক শক্তি ও জনপ্রিয়তারও পরীক্ষা হবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। রাস্তা, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় অবকাঠামো, নাগরিক সেবা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম জড়িত। ফলে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভোটাররা শুধু জাতীয় রাজনৈতিক অবস্থান নয়, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সততা, স্থানীয় সমস্যা বোঝার সক্ষমতা এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্ককেও গুরুত্ব দিতে পারেন।

এ কারণে স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দলগুলো আলাদা প্রার্থী দিলে প্রতিটি রাজনৈতিক সংগঠনকে নিজেদের শক্তি যাচাইয়ের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ভোটারদের আস্থা অর্জনের জন্যও মাঠে সক্রিয় হতে হবে।

মিয়া গোলাম পরওয়ারের বক্তব্যে আপাতত একটি বিষয় পরিষ্কার—জামায়াতে ইসলামী স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুতি নিতে চাইছে এবং নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তে যাচ্ছে না। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও নির্বাচনী বিধির কিছু বিষয়ে তারা আপত্তি জানিয়ে যাচ্ছে।

এখন স্থানীয় নির্বাচনের তফসিল, অংশগ্রহণের বিধি, প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা এবং নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। শেষ পর্যন্ত দলগুলো কীভাবে প্রার্থী বাছাই করে এবং মাঠে কী ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে স্থানীয় নির্বাচনের রাজনৈতিক চিত্র।

সব দলের অংশগ্রহণ, প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য সমান সুযোগ এবং ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর আলাদা প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা সেই প্রতিযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন নির্বাচন কমিশন কীভাবে অভিযোগ ও দাবিগুলো মোকাবিলা করে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা কতটা ধরে রাখতে পারে, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com