প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক সেবার পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বেসরকারি খাতের এনসিসি ব্যাংক। প্রচলিত ধারার ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে চারটি শাখাকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকিং শাখায় পরিণত করেছে ব্যাংকটি। পাশাপাশি আরও শাখায় ইসলামি ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ, নতুন উইন্ডো চালু, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞ জনবল নিয়োগের কার্যক্রম চলছে। সব প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন হলে আগামী বছর পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
এনসিসি ব্যাংকের এই উদ্যোগ দেশের ব্যাংকিং খাতে ইসলামি আর্থিক সেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং ব্যবসায়িক কৌশলের পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে এনেছে। ব্যাংকটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রচলিত ব্যাংকিং কার্যক্রম থেকে শরিয়াহভিত্তিক ব্যবস্থায় যেতে প্রয়োজনীয় রূপরেখা ও নথিপত্র বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে চূড়ান্ত রূপান্তরের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণ গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ঘোষিত সময়ের মধ্যে এই পরিবর্তন সম্পন্ন হবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রস্তুতি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর।
এনসিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নূরুন নেওয়াজ জানিয়েছেন, ব্যাংকটিকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তর করার বিষয়ে তাঁরা আগ্রহী। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তাঁর প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে আগামী বছরই ব্যাংকটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ধারায় রূপান্তরিত হতে পারবে। ব্যাংকটির এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রতিষ্ঠানটির নামেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে জানা গেছে। এর আগে প্রচলিত ব্যাংক থেকে ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরিত হওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মতো এনসিসি ব্যাংকের নাম পরিবর্তনের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
দেশে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সুদভিত্তিক ঋণ ও আমানত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও ইসলামি ব্যাংকিংয়ে শরিয়াহর বিধান অনুযায়ী অর্থায়ন, বিনিয়োগ এবং মুনাফা বণ্টনের কাঠামো অনুসরণ করা হয়। এ ব্যবস্থায় অর্থায়নের ধরন, চুক্তির শর্ত, সম্পদভিত্তিক লেনদেন এবং শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। ফলে কোনো ব্যাংককে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ধারায় রূপান্তর করতে হলে শুধু কয়েকটি শাখায় সেবা চালু করাই যথেষ্ট নয়; ব্যাংকের সামগ্রিক কার্যক্রম, পণ্য, হিসাবব্যবস্থা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং কর্মীদের দক্ষতাকেও নতুন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হয়।
এনসিসি ব্যাংক ধাপে ধাপে এই পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে। ব্যাংকটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর ‘ইসলামিক ব্যাংকিং গুলশান শাখা’ চালুর মাধ্যমে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ২০২৫ সালের ২০ মার্চ চট্টগ্রামের মুরাদপুর শাখা এবং একই বছরের ২৯ ডিসেম্বর ফেনী ও ঠাকুরগাঁও শাখায় পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকিং সেবা চালু করা হয়। এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ব্যাংকটি ইসলামি ব্যাংকিংয়ের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও গ্রাহক চাহিদা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ শাখা চালুর পাশাপাশি প্রচলিত শাখাগুলোতে ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো এক চিঠিতে ৬২টি প্রচলিত শাখায় ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো চালুর অনুমতি চেয়েছিল এনসিসি ব্যাংক। এসব শাখাকে পর্যায়ক্রমে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকিং শাখায় রূপান্তরের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়। ব্যাংকটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আরও ৪০টি শাখায় ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো চালুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে শরিয়াহভিত্তিক সেবা আরও বেশি গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডোর মাধ্যমে সাধারণত কোনো প্রচলিত ব্যাংকের নির্দিষ্ট শাখায় শরিয়াহসম্মত আর্থিক সেবা দেওয়া হয়। এতে গ্রাহকেরা পুরো শাখাকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকিং শাখায় রূপান্তর করার আগেই ইসলামি ধারার আমানত ও বিনিয়োগসেবা নিতে পারেন। তবে এ ধরনের কার্যক্রমে প্রচলিত ও ইসলামি ব্যাংকিংয়ের অর্থ, হিসাব এবং লেনদেনের মধ্যে যথাযথ পৃথকীকরণ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। শরিয়াহভিত্তিক নীতিমালা অনুসরণ, আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা বাস্তবায়ন এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
এনসিসি ব্যাংকের ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রমের আর্থিক চিত্রেও সম্প্রসারণের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রমে মোট আমানতের পরিমাণ ১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা। বিনিয়োগের জন্য আরও ৮০০ কোটি টাকার ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি সুকুক বন্ডে ব্যাংকটির বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৪৮ কোটি টাকা বলে জানানো হয়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকে ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রমে ব্যাংকটির আর্থিক অংশগ্রহণের একটি ধারণা পাওয়া যায়। তবে আমানত ও বিনিয়োগের পরিমাণের পাশাপাশি সম্পদের গুণগত মান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, গ্রাহকসেবা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতাও ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ সাফল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সুকুক সাধারণত শরিয়াহসম্মত সম্পদ, প্রকল্প বা বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত আর্থিক সনদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইসলামি আর্থিক ব্যবস্থায় এটি বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এনসিসি ব্যাংকের সুকুকে বিনিয়োগের তথ্য থেকে বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রমে শুধু আমানত সংগ্রহেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক উপকরণ ব্যবহার করছে। তবে এসব বিনিয়োগের প্রকৃতি, মেয়াদ ও মুনাফার বিস্তারিত তথ্য মূল্যায়নের জন্য আরও আর্থিক তথ্য প্রয়োজন।
ব্যাংকটির রূপান্তর পরিকল্পনায় দক্ষ জনবল তৈরি একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলামি ব্যাংকিংয়ের পণ্য, চুক্তি ও লেনদেনের কাঠামো প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের তুলনায় ভিন্ন হওয়ায় কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। এনসিসি ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক ফাইন্যান্সের মাধ্যমে ৩৬৩ জন কর্মকর্তাকে ছয় দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অনলাইন ও সরাসরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ২০০ কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। ব্যাংকটির পরিকল্পনা হলো, সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পর্যায়ক্রমে এই প্রশিক্ষণের আওতায় আনা।
প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি না হলে নতুন ব্যাংকিং কাঠামো কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন হতে পারে। গ্রাহকের হিসাব খোলা, আমানত ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ প্রস্তাব যাচাই, চুক্তি তৈরি এবং শরিয়াহসম্মত লেনদেন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কর্মীদের সঠিক জ্ঞান প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নীতিমালা, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা এবং গ্রাহকদের কাছে পণ্য ও সেবার ব্যাখ্যা দেওয়ার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। তাই এনসিসি ব্যাংকের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে রূপান্তরের প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রচলিত ব্যাংক থেকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ও তদারকি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এনসিসি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ধীরে ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রম বাড়ানো হচ্ছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়ার বিষয়ে তাঁরা আশাবাদী। তবে পূর্ণাঙ্গ রূপান্তরের আগে ব্যাংকটির সব কার্যক্রমকে প্রযোজ্য নিয়ম, হিসাবব্যবস্থা এবং শরিয়াহভিত্তিক পরিচালন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রতি আগ্রহের পেছনে গ্রাহকদের ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি আর্থিক পণ্য ও বিনিয়োগের বিকল্প ব্যবস্থার চাহিদাও ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া ইসলামি ব্যাংকগুলোর জন্য প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় নগদ সংরক্ষণ ও বিধিবদ্ধ তারল্য সংরক্ষণের কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন নিয়ম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রচলিত ব্যাংকগুলোকে আমানতের ১৭ শতাংশ অর্থ নগদ সংরক্ষণ অনুপাত (সিআরআর) ও সংবিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (এসএলআর) হিসেবে রাখতে হয়, আর ইসলামি ধারার ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই হার সাড়ে ৯ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে এ ধরনের বিধান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে এবং নির্দিষ্ট ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন।
ব্যাংকিং খাতে ইসলামি ধারায় রূপান্তরের সিদ্ধান্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন। এর সাফল্য নির্ভর করবে শুধু নতুন শাখা খোলা কিংবা আমানত বাড়ানোর ওপর নয়; বরং গ্রাহকের আস্থা, শরিয়াহসম্মত পরিচালনা, আর্থিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপরও। এনসিসি ব্যাংক আগামী বছর পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা বাস্তবায়িত হলে দেশের ব্যাংকিং খাতে আরেকটি বড় কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটবে। এখন নজর থাকবে প্রস্তুতি কত দ্রুত এগোয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন কখন পাওয়া যায় এবং রূপান্তরের পর ব্যাংকটি কীভাবে গ্রাহকদের জন্য সেবা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত