সার না পেয়ে নাগেশ্বরীতে ফের কৃষকদের সড়ক অবরোধ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
সার না পেয়ে নাগেশ্বরীতে ফের কৃষকদের সড়ক অবরোধ

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে রবি মৌসুমের শুরুতেই চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়ার অভিযোগে আবারও সড়কে নেমেছেন কৃষকেরা। শুক্রবার সকালে উপজেলার বল্লভেরখাস ইউনিয়নের গাবতলা বাজার এলাকায় কয়েক শ কৃষক জড়ো হয়ে সার পাওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে গাছের গুঁড়ি ফেলে সড়ক অবরোধ করেন তারা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে সার বিতরণের দায়িত্বে থাকা এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকেও কিছু সময় অবরুদ্ধ করে রাখেন বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা।

শুক্রবার সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ ঘণ্টা গাবতলা বাজার এলাকায় এ অবরোধ চলে। পরে নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ঘটনাস্থলে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পর্যায়ক্রমে প্রয়োজন অনুযায়ী সার দেওয়ার আশ্বাস দিলে তারা অবরোধ তুলে নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরাও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, রবি মৌসুমের বিভিন্ন ফসলের আবাদ ঘিরে এখন মাঠে সারের চাহিদা বাড়ছে। আমন ধানের পাশাপাশি বেগুন, বিভিন্ন ধরনের সবজি, ভুট্টাসহ অন্যান্য ফসলের চাষাবাদ চলছে। ফসলের প্রয়োজনীয় সময়ে সার না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। তাদের অভিযোগ, দিনের পর দিন ডিলারের কাছে ঘুরেও অনেকে প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না। ফলে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে।

শুক্রবার সকালে গাবতলা এলাকার কৃষকদের জন্য নির্ধারিত বিসিআইসি ডিলার মেসার্স ভাই ভাই ট্রেডার্সের কাছে সার বিক্রি শুরু হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকেরা সেখানে আসতে শুরু করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডিলার পয়েন্টের সামনে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। অনেক কৃষক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। কিন্তু একপর্যায়ে তাদের জানানো হয়, বরাদ্দকৃত সার শেষ হয়ে গেছে। এরপর সার বিক্রি বন্ধ হয়ে গেলে অপেক্ষমাণ কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।

কৃষকদের একাংশ তখন ডিলার ও সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাদের দাবি ছিল, যদি এলাকায় পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ থাকে, তাহলে কৃষকেরা কেন নির্ধারিত সময়ে সার পাচ্ছেন না—এর স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। একই সঙ্গে তারা সংশ্লিষ্ট ডিলার ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা গাবতলা বাজারের সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। এতে ওই এলাকায় যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। পরে উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসে।

কৃষক ওমর ফারুক বলেন, এর আগেও কচাকাটা এলাকায় সারের দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল। তখন উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংকট সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি বলে তার অভিযোগ। তার ভাষায়, সময় যত যাচ্ছে কৃষকদের মধ্যে সার না পাওয়ার উদ্বেগ ততই বাড়ছে।

গাবতলা গ্রামের কৃষক মজিবরও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, সারের অভাবে চাষাবাদ নিয়ে কৃষকেরা সমস্যায় পড়েছেন। অনেক সময় ডিলারের কাছে গিয়ে অপেক্ষা করেও সার পাওয়া যায় না। এ কারণে বাধ্য হয়ে কৃষকেরা সড়কে নেমেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

আরেক কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সার পাওয়ার জন্য ডিলারের কাছে ঘুরছেন। শুক্রবার সার পাওয়ার আশায় লাইনে দাঁড়ালেও পরে তাদের জানানো হয়, সার শেষ হয়ে গেছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে যদি পর্যাপ্ত সার থাকার কথা বলা হয়, তাহলে মাঠপর্যায়ে কৃষকেরা কেন তা পাচ্ছেন না—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।

তবে কৃষকদের অভিযোগের বিপরীতে উপজেলা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নাগেশ্বরীতে সার মজুদের ঘাটতি নেই। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহরিয়ার হোসেন জানান, ওই দিন দুটি পয়েন্ট থেকে সার বিতরণের কথা ছিল। একটি পয়েন্টের বরাদ্দকৃত সার শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে সেখানে অপেক্ষমাণ কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। পরে অন্য পয়েন্ট থেকে কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সার দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কৃষকদের আশ্বস্ত করা হয়েছে যে পর্যায়ক্রমে তাদের প্রয়োজনীয় সার সরবরাহ করা হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, একসঙ্গে অনেক কৃষক সার নিতে আসায় এবং একটি বিক্রয়কেন্দ্রে বরাদ্দ শেষ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের বিষয়টি বোঝানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সবাইকে সার দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, সার বিতরণে কোনো ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলে মাঠপর্যায়ে সার বিতরণের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং কৃষকের কাছে নির্ধারিত ব্যবস্থায় সার পৌঁছানো এখন প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নাগেশ্বরীতে সার নিয়ে কৃষকদের বিক্ষোভ অবশ্য নতুন নয়। চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে একই ধরনের অভিযোগে কৃষকেরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছেন। এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বর বেরুবাড়ী, বামনডাঙ্গা ও রামখানা ইউনিয়নে কৃষকেরা সার না পাওয়ার অভিযোগে সড়কে অবস্থান নেন। প্রশাসনের আশ্বাসের পর সেসব কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়। এর আগে কচাকাটা এলাকাতেও সার না পাওয়া নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উত্তেজনার ঘটনা ঘটে।

কুড়িগ্রামের অন্যান্য উপজেলাতেও চলতি মৌসুমে সার সরবরাহ নিয়ে কৃষকদের অসন্তোষের খবর পাওয়া গেছে। কোথাও দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে, আবার কোথাও ডিলার পয়েন্টের সামনে বিক্ষোভ বা সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকায় পর্যাপ্ত মজুদের কথা বলা হচ্ছে। ফলে সরকারি মজুদ, বরাদ্দ এবং মাঠপর্যায়ে প্রকৃত সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সার সরবরাহের বিষয়টি কৃষকের কাছে শুধু একটি প্রশাসনিক বা বাজার ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়। চাষাবাদের নির্দিষ্ট সময়ে প্রয়োজনীয় সার না পেলে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য কয়েক দিন দেরিও অতিরিক্ত ব্যয়, শ্রম এবং উৎপাদন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অনেক কৃষক আগাম সার সংগ্রহ করতে না পারলে পরবর্তী সময়ে বেশি দামে সার কেনার চাপেও পড়তে পারেন।

অন্যদিকে, সার বিতরণ ব্যবস্থায় প্রকৃত চাহিদা নির্ধারণ, ইউনিয়নভিত্তিক বরাদ্দ, ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ এবং কৃষকের কাছে বিক্রির প্রক্রিয়ার মধ্যে কোনো জায়গায় সমস্যা হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারি বরাদ্দ পর্যাপ্ত হলেও যদি তা সময়মতো নির্দিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্রে না পৌঁছায়, অথবা এক কেন্দ্রে চাহিদার তুলনায় কম পড়ে, তাহলে মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম সংকটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

নাগেশ্বরীর শুক্রবারের ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনেছে। একদিকে কৃষকেরা বলছেন, তারা প্রয়োজনের সময়ে সার পাচ্ছেন না; অন্যদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, উপজেলায় পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে তা বিতরণ করা হবে। দুই পক্ষের এই বক্তব্যের মধ্যকার ব্যবধান দূর করতে কার্যকর সরবরাহ ও স্বচ্ছ বিতরণ ব্যবস্থার ওপরই এখন গুরুত্ব দিতে হবে।

পাঁচ ঘণ্টার অবরোধ শেষ হয়েছে প্রশাসনের আশ্বাসে। কিন্তু কৃষকদের উদ্বেগ পুরোপুরি শেষ হয়েছে কি না, তা নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোতে তারা বাস্তবে প্রয়োজন অনুযায়ী সার পান কি না তার ওপর। কারণ মাঠে ফসলের পরিচর্যার সময় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। কৃষকের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি সময়মতো, নির্ধারিত দামে এবং হয়রানিমুক্তভাবে প্রয়োজনীয় সার হাতে পাওয়া।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত