জাপানে যাচ্ছে বাংলাদেশে তৈরি গাড়ির সিটের কভার

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৯ বার

প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নারায়ণগঞ্জের আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) তৈরি হচ্ছে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের আসনের ট্রিম কভার, যা রপ্তানি হয়ে যাচ্ছে জাপানে। সেখানে এসব কভার ব্যবহার করে পূর্ণাঙ্গ আসন তৈরি করা হয় এবং পরে হোন্ডা, সুজুকি, ইয়ামাহা ও কাওয়াসাকিসহ বিভিন্ন জাপানি নির্মাতার যানবাহনে তা সংযোজন করা হচ্ছে।

আদমজী ইপিজেডে কার্যক্রম পরিচালনাকারী জাপানি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান টিএস টেক বাংলাদেশ লিমিটেড ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে উৎপাদন শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত দেশে ৪৬ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। কারখানাটিতে বর্তমানে ৩৭৫ জন কর্মী কাজ করছেন।

প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি কার্যক্রমও ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত অর্থবছরে টিএস টেক বাংলাদেশ ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। মূলত জাপানের গাড়ি ও মোটরসাইকেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আসনের ট্রিম কভার সরবরাহ করছে তারা।

বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া ছয়তলা স্ট্যান্ডার্ড ফ্যাক্টরি বিল্ডিংয়ে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। কারখানায় চামড়া ও অন্যান্য উপকরণ নির্দিষ্ট নকশা অনুযায়ী কেটে বিভিন্ন অংশ প্রস্তুত করা হয়। পরে সেলাইয়ের মাধ্যমে এসব অংশ যুক্ত করে তৈরি করা হয় আসনের ট্রিম কভার। কাঁচামালের বড় অংশই জাপান ও চীন থেকে আমদানি করা হয়।

তৈরি পণ্যগুলো পরে জাপানে টিএস টেকের বিভিন্ন কারখানায় পাঠানো হয়। সেখানে ট্রিম কভার ব্যবহার করে সম্পূর্ণ আসন প্রস্তুত করা হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সেই আসন সরবরাহ করা হয়।

টিএস টেক বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাতোরু ওনিশি জানান, জাপানে প্রতিষ্ঠানটির বড় ক্রেতাদের মধ্যে হোন্ডা, ইয়ামাহা, সুজুকি ও কাওয়াসাকি রয়েছে। বাংলাদেশে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের আসনের ট্রিম কভারের পাশাপাশি দরজা ও ছাদের ট্রিমসহ বিভিন্ন প্লাস্টিকের যন্ত্রাংশও তৈরি করা হয়।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মূলত কাঁচামাল কাটা ও সেলাইয়ের কাজ সম্পন্ন করা হয়। এরপর জাপানে পাঠানো এসব উপকরণ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ আসন তৈরি করে তা গাড়ি নির্মাতাদের সরবরাহ করা হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশের কারখানাটিতে বছরে প্রায় ২ লাখ ৬ হাজার সিটের ট্রিম কভার উৎপাদন হচ্ছে। আগামী বছরও প্রায় একই মাত্রায় উৎপাদন বজায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

কারখানাটির উৎপাদন ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অটোমেশনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে টিএস টেক। নিজস্ব উৎপাদন কার্যক্রমে থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তিও ব্যবহার করছে প্রতিষ্ঠানটি।

কারখানা পরিদর্শনের সময় দেখা যায়, উৎপাদন এলাকায় বিভিন্ন ধাপে কর্মীরা কাজ করছেন। কোথাও চামড়া ও অন্যান্য উপকরণ কাটা হচ্ছে, কোথাও সেলাই মেশিনে বিভিন্ন অংশ জোড়া দেওয়া হচ্ছে। আবার তৈরি কভার পরীক্ষা ও মাপজোখের কাজও চলছে।

উৎপাদন প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করতে ২০২৩ সালের আগস্টে কনভেয়ার বেল্ট, অটোমেশন ব্যবস্থা ও অটো-লে মেশিনসহ বেশ কয়েকটি প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়। উৎপাদনে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের জিগ ও সহায়ক সরঞ্জামও কারখানাটিতে তৈরি করা হয়। এর মধ্যে কিছু সরঞ্জাম থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে।

টিএস টেক বৈশ্বিকভাবে একটি বড় শিল্পগোষ্ঠী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১৩টি প্রতিষ্ঠানের অধীনে তাদের ৭৩টি কারখানা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার কর্মী কাজ করেন। এর মধ্যে জাপানেই কর্মরত প্রায় ১৬ হাজার।

সাতোরু ওনিশি বলেন, জাপানের বাজারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি জাপানের বাইরেও টিএস টেক আন্তর্জাতিক গাড়ি নির্মাতাদের সঙ্গে ব্যবসা করছে। ফলে বাংলাদেশের কারখানার উৎপাদন কার্যক্রমও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে কাজ করছে।

শুধু উৎপাদন ও রপ্তানি নয়, কর্মীদের কল্যাণেও বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কারখানার মোট কর্মীর প্রায় ৬০ শতাংশ নারী। কর্মজীবী নারীদের সহায়তায় ২০২৫ সালে কারখানার ভেতরেই একটি ডে-কেয়ার সেন্টার চালু করা হয়েছে।

বর্তমানে পাঁচজন শিশুসেবিকার তত্ত্বাবধানে সেখানে ১৯টি শিশু রয়েছে। কর্মীদের সন্তানদের কর্মস্থলের কাছাকাছি নিরাপদ পরিবেশে রাখার সুযোগ থাকায় মায়েরা তুলনামূলক নিশ্চিন্তে কাজে মনোযোগ দিতে পারছেন।

প্রতিষ্ঠানটির একজন জাপানি ভাষার দোভাষী জানান, তার সন্তানও ডে-কেয়ার সেন্টারে থাকে। ফলে সন্তানকে কর্মস্থলের ভেতরেই রেখে তিনি নিশ্চিন্তে নিজের দায়িত্ব পালন করতে পারছেন।

গর্ভবতী কর্মীদের জন্যও আলাদা সুবিধা চালু রয়েছে। তাদের শনাক্ত করতে সবুজ রিবন ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ সহায়তা দেওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গর্ভাবস্থায় কর্মীদের জন্য অতিরিক্ত যত্ন ও সহযোগিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।

বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদিত গাড়ির যন্ত্রাংশের এমন রপ্তানি দেশের শিল্পখাতের জন্য নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক অটোমোটিভ সাপ্লাই চেইনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়াতে দক্ষ শ্রমশক্তি, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতার সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। টিএস টেকের কার্যক্রম সেই সম্ভাবনার একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত