মঙ্গলবার রাত থেকে স্বাভাবিক হচ্ছে শিল্পের গ্যাস-বিদ্যুৎ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
মঙ্গলবার রাত থেকে স্বাভাবিক হচ্ছে শিল্পের গ্যাস-বিদ্যুৎ

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শিল্প-কারখানায় চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পর স্বস্তির আশ্বাস পেয়েছেন ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, আগামী মঙ্গলবার রাত থেকে শিল্প-কারখানাগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ সংকটের আগের স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের এ আশ্বাস বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, কারখানার কর্মঘণ্টা কমে যাওয়া এবং জ্বালানি সংকটে বাড়তি ব্যয়ের মতো সমস্যাগুলো থেকে শিল্পখাত ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।

সোমবার সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পথরেখা’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় এ আশ্বাস দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় ২১টি ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলা বৈঠকে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের বর্তমান পরিস্থিতি, শিল্প উৎপাদনে এর প্রভাব এবং সংকট মোকাবিলায় সরকারের স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সভা শেষে বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শিল্প-কারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাত থেকে পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ব্যবসায়ী মহলের কাছে এটি বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ফজলুল হক বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ কমবেশি সমস্যায় পড়েছেন। বিশেষ করে শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সংকট তৈরি হওয়ার আগে যে পর্যায়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল, আগামীকাল রাত থেকে সেই পর্যায়ে ফিরে যাওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন সময় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও সীমিত সক্ষমতায় উৎপাদন চালিয়ে যেতে হয়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন অব্যাহত রাখার চেষ্টা করতে হয়েছে, এতে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য এমন পরিস্থিতি একদিকে যেমন আর্থিক চাপ তৈরি করেছে, অন্যদিকে সময়মতো পণ্য সরবরাহ ও রপ্তানি কার্যক্রম নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

এই বাস্তবতায় সরকারের পক্ষ থেকে শিল্পখাতে দ্রুত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার আশ্বাস ব্যবসায়ী মহলে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি করেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, স্পিনিং, সিরামিক, স্টিল, কাগজ, কেমিক্যালসহ গ্যাস ও বিদ্যুৎনির্ভর শিল্পগুলোতে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও নিয়মিত কর্মঘণ্টা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সভায় শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার বিষয়েই আলোচনা হয়নি, বরং ভবিষ্যতে যাতে জ্বালানি সংকট শিল্পায়নের পথে বড় বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে বিষয়েও একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, সভায় কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।

তিনি জানান, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সামনে তুলে ধরেছেন। সরকারের লক্ষ্য শুধু বর্তমান সংকট সামাল দেওয়া নয়, বরং ভবিষ্যতের শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা তৈরি করা।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার একাধিক ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রাথমিকভাবে তিনটি এবং পরবর্তী সময়ে আরও দুটি—মোট পাঁচটি এফএসআরইউ স্থাপনের কাজ নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। ২০২৮ সালের আগেই তৃতীয় এফএসআরইউ-এর কাজ শুরু করার চেষ্টা চলছে বলে জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস গ্রহণ ও সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের কাজ চলমান রয়েছে। এসব কূপের কাজ শেষ হওয়ার পর আরও ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতার চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এফএসআরইউ স্থাপনের পাশাপাশি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল এবং নতুন গ্যাসলাইন স্থাপনের মতো বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে একক উৎসের ওপর নির্ভরশীল না রেখে বিভিন্ন উৎস ও অবকাঠামোর মাধ্যমে শক্তিশালী করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বর্তমান সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, এলএনজি আমদানিতে বিঘ্ন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি ঘাটতির মতো একাধিক কারণ কাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সরবরাহের ওপর আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রভাবও পড়েছে। ফলে দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের চাহিদা এবং সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে। শিল্প খাতের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে।

এর আগে প্রধানমন্ত্রীও চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত মোকাবিলার বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি, এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে সোমবারের বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তুলে ধরার পাশাপাশি সংকট সমাধানে বাস্তবায়ন পরিকল্পনার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। এফবিসিসিআই প্রশাসক ফজলুল হকের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যবসায়ীরা সরকারের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন উদ্যোগ নিয়ে আশ্বস্ত হয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, পরিকল্পনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন হলে শিল্পের বিকাশ এবং নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে।

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, সরকার ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে। তাঁর মতে, অতীত সময়ে তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো একদিনে, এক মাসে কিংবা এক বছরে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সমস্যাগুলো সমাধানে সরকারের দায়বদ্ধতা ও আন্তরিকতা রয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও রয়েছে।

শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আশ্বাসের দ্রুত বাস্তবায়ন। মঙ্গলবার রাত থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরতে শুরু করলে উৎপাদন ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক স্বস্তি আসতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা কারখানাগুলো নিয়মিত উৎপাদনে ফিরতে পারলে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও স্থিতিশীল হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় কমানো, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে শিল্পখাতে স্থায়ী স্বস্তি নিশ্চিত করতে শুধু সাময়িক সরবরাহ বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি আমদানি ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন গ্যাসলাইন ও টার্মিনাল নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির বহুমুখীকরণে ঘোষিত পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়নই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যবসায়ী মহলও চাইছে, বর্তমান সংকট সামাল দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য এমন একটি স্থিতিশীল জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যেখানে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন পরিকল্পনা করতে গিয়ে বারবার গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তায় পড়বে না।

সরকারের সাম্প্রতিক আশ্বাস তাই শিল্পখাতের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তির বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এখন মঙ্গলবার রাত থেকে বাস্তবে কতটা সরবরাহ স্বাভাবিক হয় এবং ঘোষিত স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কতটা দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, সেটিই হবে শিল্প উদ্যোক্তা, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত