প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ স্তর ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১২ নভেম্বর দেশের ৮০টি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদে ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু হতে পারে। পর্যায়ক্রমে সাত ধাপে সারা দেশের ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করেছে কমিশন। তবে ভোটের তারিখ ও ধাপভিত্তিক নির্বাচনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
সোমবার নির্বাচন কমিশনের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি জানান, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের আগে প্রাক-প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের অন্যতম বৃহৎ এই আয়োজনকে সামনে রেখে কমিশন প্রাথমিকভাবে সময়সূচি ও ধাপভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি করেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা ৪ হাজার ৫৮০টি। এত বিপুলসংখ্যক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে ভোট আয়োজন না করে সাতটি ধাপে নির্বাচন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে নির্বাচন পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি ধাপে ধাপে সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে কমিশন।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ হতে পারে ১২ নভেম্বর। এই ধাপে ৮০টি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের কথা ভাবা হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় ধাপের ভোট ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপ আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপের ভোট ২৭ মে আয়োজনের প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, এসব তারিখ এখনো চূড়ান্ত নয়। কমিশনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত, প্রস্তুতি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর ভোটের সময়সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে ১২ নভেম্বরের ভোটকে আপাতত সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দেশের গ্রামীণ জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিকদের সবচেয়ে কাছের জনপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম হলো ইউনিয়ন পরিষদ। গ্রামের রাস্তা, সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক সেবা, নাগরিক সহায়তা এবং স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা রয়েছে। ফলে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয় নয়, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও স্থানীয় উন্নয়নের সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সাত ধাপের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘ সময় ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে একদিকে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে বিভিন্ন ইউনিয়নে জনপ্রতিনিধিত্বের কাঠামো নতুন করে সাজানোর প্রক্রিয়াও শুরু হবে।
কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দেশের সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। নির্বাচন কমিশনের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ, প্রার্থী মনোনয়ন, নির্বাচনী পরিবেশ এবং মাঠপর্যায়ের নানা বাস্তবতা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্তের ফলে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন আয়োজনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত ও প্রত্যাশা জানার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়াও সহজ হতে পারে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় বাস্তবতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য কমিশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বিশালসংখ্যক ভোটকেন্দ্র ও ভোটারের ব্যবস্থাপনা। ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়নে নির্বাচন হলে বিপুলসংখ্যক ভোটকেন্দ্রে একযোগে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হবে। এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টন, নির্বাচনী সামগ্রী সরবরাহ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ভোটের দিন মাঠ প্রশাসনের সমন্বয়।
সাত ধাপে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনার ফলে কমিশন এসব কাজ পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করতে পারবে। একটি ধাপের অভিজ্ঞতা পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতিতেও কাজে লাগানো সম্ভব হবে। কোথাও কোনো প্রশাসনিক বা ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা দেখা দিলে পরবর্তী ধাপে তা সংশোধনের সুযোগ থাকবে। ফলে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাপনাকে তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালনা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইউনিয়ন পরিষদের ভোট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হলেও অনেক সময় স্থানীয় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় ভিন্ন চিত্র দেখাতে পারে। নির্বাচনের পরিবেশ, প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভোটারদের নিরাপত্তা এবং ভোটকেন্দ্রে নির্বিঘ্নে যাওয়ার সুযোগ—এসব বিষয় ভোটার উপস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এসব বিষয় কতটা গুরুত্ব পাবে, তা আগামী দিনের প্রস্তুতিতে স্পষ্ট হবে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ তাদের মতামত তুলে ধরার সুযোগ পাবে। এতে ভোটারদের আস্থা বাড়ানো এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে কমিশন আরও কার্যকর প্রস্তুতি নিতে পারবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
প্রথম ধাপে ৮০টি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনাও কমিশনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ধাপ হতে পারে। তুলনামূলকভাবে সীমিতসংখ্যক এলাকায় নির্বাচন আয়োজন করে কমিশন মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়া এবং ফলাফল ব্যবস্থাপনার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে। পরবর্তী ধাপগুলোতে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
তবে নির্বাচনের সময়সূচি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের নজর থাকবে কমিশনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। ১২ নভেম্বর প্রথম ধাপের ভোট অনুষ্ঠিত হবে কি না, কোন ৮০টি উপজেলার ইউনিয়ন এতে অন্তর্ভুক্ত হবে, নির্বাচনী তফসিল কবে ঘোষণা করা হবে এবং প্রার্থীদের মনোনয়ন ও অন্যান্য কার্যক্রমের সময়সূচি কী হবে—এসব বিষয় পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট হবে।
নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন মূল কাজ হলো একটি গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা। একই সঙ্গে ভোটারদের নিরাপত্তা, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মতো ব্যাপক একটি আয়োজন সফল করতে নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি মাঠ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটার—সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
গ্রামীণ বাংলাদেশের মানুষের কাছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন তাই শুধু একটি ভোটের আয়োজন নয়। স্থানীয় নেতৃত্ব নির্ধারণ, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং নাগরিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘদিন পর কোনো কোনো ইউনিয়নে নতুন নেতৃত্ব আসতে পারে, আবার কোথাও বর্তমান জনপ্রতিনিধিরাই পুনরায় জনগণের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করবেন। এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের নতুন সমীকরণও তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ১২ নভেম্বর ৮০টি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদে ভোট আয়োজনের প্রাথমিক পরিকল্পনা দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নতুন পর্বের সূচনা করতে যাচ্ছে। সাত ধাপে ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়নে নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এটি হবে নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় ধরনের প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত আয়োজন। এখন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা, নির্বাচনী এলাকার প্রস্তুতি এবং মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর কমিশন কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে থাকবে দেশের স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতি ও সাধারণ ভোটাররা।