প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর তলদেশে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও রুপার মজুদের সন্ধান পেয়েছেন চীনা বিজ্ঞানীরা। সমুদ্রের তলদেশে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণা অভিযানে এমন একটি বিশাল খনিজ এলাকার সন্ধান মিলেছে, যেখানে স্বর্ণ ও রুপার ঘনত্ব প্রচলিত অনেক স্থলভাগের আকরিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। এই আবিষ্কার গভীর সমুদ্রের খনিজ সম্পদ নিয়ে বৈশ্বিক আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়, চিংদাও ইনস্টিটিউট অব মেরিন জিওলজি এবং সাংহাই জিয়াও টং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা যৌথভাবে এই অনুসন্ধান পরিচালনা করেন। গবেষণার সময় পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের একটি ব্যাক-আর্ক বেসিন এলাকায় সমুদ্রতলের হাইড্রোথার্মাল অঞ্চলে তাঁরা বিপুল পরিমাণ খনিজের উপস্থিতি শনাক্ত করেন। এসব এলাকায় ভূগর্ভের অত্যন্ত উত্তপ্ত ও খনিজসমৃদ্ধ তরল সমুদ্রতলের বিভিন্ন ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসে। দীর্ঘ সময় ধরে এই তরল ঠান্ডা ও রাসায়নিকভাবে পরিবর্তিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের ধাতব খনিজ সেখানে জমা হতে থাকে।
গবেষকদের অনুসন্ধানে সমুদ্রতলের ওই এলাকায় শঙ্কুর মতো আকৃতির তিনটি বড় খনিজ স্তরের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলোকে হাইড্রোথার্মাল সালফাইড স্তর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাধারণত এ ধরনের ভূতাত্ত্বিক গঠনে তামা, দস্তা ও সিসার মতো ধাতুর পাশাপাশি অল্প পরিমাণ স্বর্ণ ও রুপাও পাওয়া যায়। কিন্তু এবারের নমুনাগুলোতে স্বর্ণ ও রুপার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি হওয়ায় গবেষকদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
প্রাথমিক পরীক্ষায় কিছু নমুনায় এমন ঘনত্ব পাওয়া গেছে, যা স্থলভাগে স্বর্ণ ও রুপার প্রচলিত আকরিকের ঘনত্বকেও ছাড়িয়ে গেছে। গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মার্কিন শর্ট টন আকরিতে সর্বোচ্চ ০.৪৫ ট্রয় আউন্স স্বর্ণ এবং ৩৬.৩ ট্রয় আউন্স রুপার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অন্য কিছু নমুনায় প্রতি টন আকরিতে স্বর্ণের পরিমাণ সর্বোচ্চ ১৫.৪ গ্রাম এবং রুপা ১ হাজার ২৭১ গ্রাম পর্যন্ত পাওয়া গেছে।
এই পরিমাণের কারণে আবিষ্কৃত খনিজ এলাকার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মূল্য নিয়ে গবেষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। গবেষণা দলের অন্যতম প্রধান বিজ্ঞানী সং শিজির মতে, বিশাল এই সমুদ্রতলীয় খনিজ এলাকায় অত্যন্ত উচ্চ অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে। তাঁর নেতৃত্বাধীন গবেষণা দলের ধারণা, ওই অঞ্চলে বহু ধাতব সালফাইডের যে সম্ভাব্য মজুদ রয়েছে, তা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রতলীয় খনিজ মজুদের সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে।
তবে গবেষণাটি এখনো সমুদ্রতলের খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা শনাক্ত করার পর্যায়ে রয়েছে। কোনো একটি এলাকায় উচ্চ ঘনত্বের স্বর্ণ ও রুপা পাওয়া গেলেই সেখানে বাণিজ্যিকভাবে খনন কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয় না। এর জন্য খনিজের বিস্তৃতি, মোট মজুদের পরিমাণ, উত্তোলন ব্যয়, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং পরিবেশগত প্রভাবসহ একাধিক বিষয় বিশদভাবে যাচাই করতে হয়। ফলে আবিষ্কারটি অর্থনৈতিকভাবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
চীনা গবেষকদের এই অভিযান শুরু হয়েছিল গত ১০ আগস্ট। শেনজেন থেকে গবেষণা জাহাজ ‘শিয়াং ইয়াং হং ১০’-এ করে তাঁরা ১৮ দিনের অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করেন। অভিযানের সময় সাবমার্সিবল ব্যবহার করে গবেষকেরা সাতবার সমুদ্রের তলদেশে ডুব দেন। এসব ডুবের মাধ্যমে তাঁরা সমুদ্রতলের ভূতাত্ত্বিক গঠন, খনিজ স্তর এবং হাইড্রোথার্মাল কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন।
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের ব্যাক-আর্ক বেসিনে পরিচালিত এই অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সমুদ্রতলের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া এবং সেখানে সৃষ্ট খনিজ সম্পদের ধরন বোঝা। সমুদ্রের তলদেশে হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট বা উত্তপ্ত তরল নির্গমনের অঞ্চলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্র। এসব অঞ্চলে পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে উঠে আসা উত্তপ্ত তরল সমুদ্রের ঠান্ডা পানির সংস্পর্শে এসে দ্রুত রাসায়নিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। এর ফলে বিভিন্ন ধাতব যৌগ তলদেশে জমা হয়ে সময়ের সঙ্গে বড় খনিজ স্তর তৈরি করতে পারে।
গবেষণার সময় জাহাজটির চলাচল তাইওয়ানের উত্তর ও পূর্বাঞ্চল এবং ফিলিপাইনের উত্তরের জলসীমার কাছাকাছি এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বলে সামুদ্রিক চলাচলের তথ্য থেকে জানা গেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যে বেসিন এলাকায় খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে, সেটি চীনের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত। তবে ওই এলাকার সুনির্দিষ্ট স্থানাঙ্ক এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
সমুদ্রের গভীরে থাকা স্বর্ণ, রুপা ও অন্যান্য ধাতব সম্পদ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। স্থলভাগে সহজে উত্তোলনযোগ্য অনেক খনিজ সম্পদের মজুদ সীমিত হওয়ায় ভবিষ্যতে গভীর সমুদ্রের সম্পদ নতুন উৎস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উন্নত ইলেকট্রনিকস এবং আধুনিক শিল্পে বিভিন্ন ধাতুর চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রতলের খনিজ সম্পদ নিয়েও আলোচনা বাড়ছে।
তবে গভীর সমুদ্র থেকে খনিজ উত্তোলনের সম্ভাবনার পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকিও রয়েছে। সমুদ্রতলের খনিজ স্তর সরিয়ে ফেললে সেখানে থাকা অণুজীব, সামুদ্রিক প্রাণী এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপর কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। হাইড্রোথার্মাল অঞ্চলে এমন কিছু জীব ও অণুজীবের বসবাস রয়েছে, যারা পৃথিবীর অন্য অনেক পরিবেশের তুলনায় ভিন্ন ধরনের জীবনধারার সঙ্গে অভিযোজিত। ফলে বাণিজ্যিক খনন শুরু হলে এসব বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতির সম্ভাবনা কতটা, তা আগে থেকেই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
গভীর সমুদ্রের খনিজ উত্তোলনের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তি ও ব্যয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কয়েক হাজার মিটার গভীরে গিয়ে খনিজ সংগ্রহ, তা জাহাজে তোলা এবং পরে স্থলভাগে নিয়ে আসার জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রতিকূল সমুদ্র পরিবেশে দীর্ঘ সময় কাজ করার মতো নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করাও কঠিন। ফলে শুধু খনিজের উচ্চ ঘনত্ব পাওয়া গেলেই তা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হয়ে যায় না।
চীনা গবেষকদের সাম্প্রতিক আবিষ্কার তাই একদিকে যেমন দেশটির সমুদ্রবিজ্ঞান ও গভীর সমুদ্র গবেষণায় অগ্রগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে গভীর সমুদ্রের সম্পদ ব্যবহারের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। আবিষ্কৃত এলাকায় প্রকৃতপক্ষে কত পরিমাণ স্বর্ণ, রুপা ও অন্যান্য ধাতু রয়েছে, তা জানতে আরও বিস্তৃত অনুসন্ধান প্রয়োজন। একই সঙ্গে মজুদের প্রকৃতি, বিস্তার ও উত্তোলনযোগ্য অংশ নির্ধারণ করাও জরুরি।
গবেষকদের প্রাথমিক ফলাফল যদি পরবর্তী অনুসন্ধানেও নিশ্চিত হয়, তাহলে প্রশান্ত মহাসাগরের এই অঞ্চল গভীর সমুদ্রের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন এবং দীর্ঘমেয়াদি সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পাবে।
সমুদ্রের অন্ধকার গভীরে মানুষের দৃষ্টির আড়ালে কোটি কোটি বছর ধরে চলা ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে এসব খনিজ সম্পদ। আধুনিক প্রযুক্তি সেই সম্পদের সন্ধান মানুষের সামনে এনে দিচ্ছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো, এই সম্পদ ভবিষ্যতে মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কতটা কাজে লাগবে এবং তা কাজে লাগাতে গিয়ে সমুদ্রের নিজস্ব পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর কতটা চাপ তৈরি হবে। চীনা বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক আবিষ্কার সেই প্রশ্নকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।