কুমিল্লা বিভাগ নিয়ে আঞ্চলিক বিদ্বেষ নয়: হাসনাত আবদুল্লাহ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৯ বার
কুমিল্লা বিভাগ নিয়ে আঞ্চলিক বিদ্বেষ নয়: হাসনাত আবদুল্লাহ

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুমিল্লাকে ঘিরে বিভাগ গঠনের আলোচনা যেন কোনোভাবেই আঞ্চলিক বিভেদ, বিদ্বেষ বা পারস্পরিক বিরোধের কারণ না হয়—এমন আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেছেন, প্রশাসনিক বা সাংগঠনিক কোনো সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে আঞ্চলিক হিংসা-বিদ্বেষ তৈরি করা উচিত নয়। বরং পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতার মাধ্যমে বৃহত্তর এলাকার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।

সোমবার সকাল ১১টায় কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। কুমিল্লা জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, সামাজিক কর্মসূচি, জনকল্যাণ এবং উন্নয়ন কার্যক্রমসহ জেলার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে সভাটির আয়োজন করা হয়।

সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ কুমিল্লা বিভাগ নিয়ে চলমান আলোচনা প্রসঙ্গে আঞ্চলিক সম্প্রীতির বিষয়টি সামনে আনেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, বিভাগ গঠন বা প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে মানুষের মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন কোনোভাবেই এক এলাকার মানুষের সঙ্গে অন্য এলাকার মানুষের বিরোধে রূপ না নেয়। তিনি বিশেষভাবে কুমিল্লা ও নোয়াখালীর দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে দুই অঞ্চলের মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, নোয়াখালীর সঙ্গে কুমিল্লার মানুষের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন সময় মানুষের চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে দুই অঞ্চলের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বিভাগকে কেন্দ্র করে সেই সম্পর্ক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে বিভাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর। একটি অঞ্চলের প্রশাসনিক কার্যক্রম সহজ করা, সরকারি সেবা মানুষের কাছে আরও দ্রুত পৌঁছে দেওয়া এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সমন্বয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিভাগীয় কাঠামোর ভূমিকা রয়েছে। এ কারণে নতুন বিভাগ গঠন বা কোনো অঞ্চলের বিভাগীয় মর্যাদা নিয়ে আলোচনা তৈরি হলে সেখানে মানুষের আবেগ ও আঞ্চলিক পরিচয়ের বিষয়টিও সামনে আসে। হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যে তাই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

মতবিনিময় সভায় কুমিল্লা জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়। জেলার বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন উপস্থিত জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।

মাদককে কেন্দ্র করে অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষেরও ভূমিকা রয়েছে। মতবিনিময় সভায় জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এসব সামাজিক সমস্যাকে কীভাবে আরও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়।

সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়ও সভার আলোচনায় স্থান পায়। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেবার মান বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষ যাতে হয়রানি ছাড়াই প্রয়োজনীয় সেবা পেতে পারেন, সে জন্য প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও জনবান্ধব করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।

কুমিল্লা জেলার জনকল্যাণমূলক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন দিক নিয়েও আলোচনা হয়েছে। জেলার অবকাঠামো, নাগরিক সেবা, সামাজিক কর্মসূচি এবং স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়টি সামনে আসে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সুফল যাতে শহর ও গ্রাম উভয় এলাকার মানুষ সমানভাবে পেতে পারেন, সে বিষয়েও প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকার প্রয়োজন রয়েছে।

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক রোজি আক্তারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও কুমিল্লা-১ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান। সভায় গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী এবং কুমিল্লা-৮ আসনের সংসদ সদস্য জাকারিয়া তাহের সুমন, কুমিল্লা-১১ আসনের সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী, কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ, কুমিল্লা-৭ আসনের সংসদ সদস্য আতিকুল আলম শাওন, কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া এবং কুমিল্লা-৫ আসনের সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী আবু, ওয়াসার চেয়ারম্যান আশিকুর রহমান মাহমুদ ভিপি ওয়াসিম এবং জেলা পরিষদ প্রশাসক হাজী মোস্তাক মিয়াসহ জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা সভায় অংশ নেন। জেলার ১৭টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রধান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও এতে উপস্থিত ছিলেন।

এ ধরনের মতবিনিময় সভা স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন সমস্যা সরাসরি আলোচনার সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, মাদক, নাগরিক সেবা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মতো বিষয়গুলো নিয়ে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা থাকলে স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যাগুলো দ্রুত চিহ্নিত ও সমাধানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কুমিল্লাকে ঘিরে বিভাগীয় কাঠামোর আলোচনা এরই মধ্যে স্থানীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে আগ্রহ তৈরি করেছে। একটি অঞ্চলের প্রশাসনিক পরিচয় ও মর্যাদা নিয়ে মানুষের আবেগ থাকা স্বাভাবিক। তবে এ ধরনের বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলে তা যেন সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট না করে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রশাসনিক সীমানা বা কাঠামো পরিবর্তন হলেও মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের বাস্তবতার ওপর গড়ে ওঠে।

হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যে সেই সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখার ওপরই জোর দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, কুমিল্লা ও নোয়াখালীর মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ রয়েছে। তাই বিভাগকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের আঞ্চলিক হিংসা বা বিদ্বেষ তৈরি হলে তা দুই অঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে যত আলোচনা থাকুক, শেষ পর্যন্ত যেকোনো প্রশাসনিক উদ্যোগের লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবন সহজ করা এবং সরকারি সেবা আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া। সেই জায়গা থেকে আঞ্চলিক পরিচয় বা প্রতিযোগিতার পরিবর্তে উন্নয়ন, সুশাসন ও নাগরিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

কুমিল্লার মতবিনিময় সভায় আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মাদক প্রতিরোধ, সুশাসন ও উন্নয়ন—বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে বিভাগ নিয়ে আলোচনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বানও এসেছে। সব মিলিয়ে সভাটি কুমিল্লার প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বৃহত্তর আঞ্চলিক সম্পর্কের বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

আঞ্চলিক পরিচয় মানুষের আত্মপরিচয়ের একটি অংশ হলেও সেটি যেন অন্য অঞ্চলের মানুষের প্রতি বিরূপতা তৈরির কারণ না হয়—হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যে এমন একটি বার্তাই গুরুত্ব পেয়েছে। কুমিল্লা ও আশপাশের অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগকে সামনে রেখে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সম্প্রীতি বজায় রাখাই ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত