রামপালের দ্বিতীয় ইউনিট বন্ধ, কমেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩২ বার
রামপালের দ্বিতীয় ইউনিট বন্ধ, কমেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কারিগরি ত্রুটির কারণে টানা চার দিন ধরে বন্ধ রয়েছে বাগেরহাটের রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২ নম্বর ইউনিট। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আগে কেন্দ্রটি জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করলেও ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ হওয়ার পর উৎপাদন ৬০০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে এসেছে।

এদিকে ত্রুটি নিরসনে ভারত থেকে দুজন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী আসার কথা থাকলেও এখনো তারা রামপালে পৌঁছাননি। ফলে কেন্দ্রটির বন্ধ হয়ে থাকা ইউনিটটি ঠিক কবে নাগাদ আবার উৎপাদনে ফিরবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত সময় জানাতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে ইউনিটটি ‘কুল ডাউন’ বা ঠান্ডা করার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। দেশীয় প্রকৌশলীরা প্রাথমিক কিছু কাজ শুরু করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

গত রোববার সকালে হঠাৎ করেই রামপাল কেন্দ্রের ২ নম্বর ইউনিটে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। কেন্দ্রসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বয়লার অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ কারিগরি জটিলতার কারণে ইউনিটটি বন্ধ করতে হয়। প্রথমদিকে ধারণা করা হয়েছিল, মেরামতের কাজ শেষ করে কয়েক দিনের মধ্যেই ইউনিটটি চালু করা সম্ভব হবে। কিন্তু চার দিন পার হলেও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা না আসায় মেরামতকাজ পুরোপুরি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত একটি বড় বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প। কেন্দ্রটির দুটি ইউনিটের মোট উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। প্রতিটি ইউনিটের সক্ষমতা ৬৬০ মেগাওয়াট। কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসে ২০২২ সালের শেষ দিকে। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় ইউনিটও উৎপাদনে যুক্ত হয় এবং ২০২৪ সালের মার্চে কেন্দ্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে।

চলতি মাসে কেন্দ্রটি জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল। উৎপাদন স্বাভাবিক থাকার সময় এখান থেকে প্রতিদিন ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছিল। ফলে বিদ্যুৎ চাহিদার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ পূরণে রামপাল কেন্দ্রের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একসঙ্গে কয়েকশ মেগাওয়াট উৎপাদন কমে গেছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউনিটটি বর্তমানে কুল ডাউন অবস্থায় রয়েছে। ইউনিটটি ঠান্ডা হওয়ার পর প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা ও মেরামতের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। এ ধরনের বড় তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লার ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতিতে কাজ করার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং কারিগরি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন হওয়ায় দ্রুত উৎপাদনে ফেরানো সব সময় সম্ভব হয় না।

কেন্দ্রটির ত্রুটি মেরামতে ভারত থেকে দুজন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী আসার কথা রয়েছে। তাদের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ ইউনিটের বয়লার ও সংশ্লিষ্ট কারিগরি ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় মেরামত ও পরীক্ষা সম্পন্ন করতে বিশেষজ্ঞ সহায়তা দরকার বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে প্রকৌশলীরা এখনো না পৌঁছানোয় ইউনিটটি পুনরায় চালুর সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা আনোয়ারুল আজিমের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এর আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, ভারতীয় প্রকৌশলীরা পৌঁছানোর পর বয়লারের প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করা হবে। প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ দেশীয় প্রকৌশলীরা এগিয়ে নিচ্ছেন।

রামপালের দ্বিতীয় ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন কমে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে গেলে উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকা সময়ে একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়েকশ মেগাওয়াট উৎপাদন বন্ধ থাকা গ্রিড ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।

খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতিতেও এর প্রভাব পড়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে কোনো কোনো এলাকায় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ বেড়েছে। তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র শিল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সেবাখাতেও ভোগান্তি বাড়তে পারে। বিশেষ করে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল ছোট ব্যবসা ও কারখানাগুলোতে বারবার বিদ্যুৎ চলে গেলে উৎপাদন ও কাজের সময়সূচি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

রামপাল কেন্দ্র থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ার সময় দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় অন্য কয়েকটি কেন্দ্রের উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি বড় কেন্দ্রের উৎপাদন কমে গেলে ঘাটতি পূরণে অন্য কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করতে হয়। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ, কেন্দ্রগুলোর কারিগরি সক্ষমতা এবং জাতীয় গ্রিডের ভারসাম্য—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাপনা করতে হয়।

রামপাল কেন্দ্রের ক্ষেত্রে কারিগরি ত্রুটি নতুন কোনো বিষয় নয়। বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসার পর বিভিন্ন সময়ে কারিগরি জটিলতা ও অন্যান্য কারণে কেন্দ্রটির উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটেছে। এর ফলে কেন্দ্রটির নির্ভরযোগ্যতা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনা হয়েছে। তবে প্রতিটি ত্রুটির ধরন ও কারণ এক নয়। তাই বর্তমান ইউনিট বন্ধ হওয়ার কারণ নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে মেরামত শেষ হওয়ার পরই এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বড় আকারের তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে বয়লার, টারবাইন, জেনারেটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ একসঙ্গে কাজ করে। এসব ব্যবস্থার কোনো একটি অংশে ত্রুটি দেখা দিলে পুরো ইউনিট বন্ধ করার প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে বয়লার অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে নিরাপত্তার কারণে ইউনিটকে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে ঠান্ডা করার প্রয়োজন হতে পারে। এরপর ধাপে ধাপে ত্রুটির কারণ শনাক্ত ও প্রয়োজনীয় মেরামত করা হয়।

বর্তমানে রামপাল কেন্দ্রের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত ও নিরাপদভাবে ২ নম্বর ইউনিটকে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা। তবে তাড়াহুড়া করে ইউনিট চালু করার চেয়ে ত্রুটির প্রকৃত কারণ শনাক্ত করে যথাযথ মেরামত সম্পন্ন করাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অসম্পূর্ণ মেরামতের পর ইউনিট পুনরায় চালু করলে একই ধরনের সমস্যা আবার দেখা দিতে পারে এবং তখন উৎপাদন বন্ধ থাকার সময় আরও দীর্ঘ হতে পারে।

কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো ২ নম্বর ইউনিট পুনরায় চালুর নির্দিষ্ট তারিখ জানানো হয়নি। বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের আগমন, কুল ডাউন প্রক্রিয়া শেষ হওয়া, ত্রুটি শনাক্তকরণ এবং মেরামত—সবকিছুর অগ্রগতির ওপরই নির্ভর করছে ইউনিটটি কবে আবার জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে পারবে।

দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যের ক্ষেত্রে রামপালের মতো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইউনিটটির মেরামত যত দ্রুত সম্ভব সম্পন্ন করে নিরাপদে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার দিকে সংশ্লিষ্টদের নজর রয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের কারিগরি সমস্যার পুনরাবৃত্তি কমাতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল এবং প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ সহায়তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত