প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর পুরান ঢাকার বহুল আলোচিত মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে মো. সোহাগকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বিচারিক কার্যক্রমে নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত। মামলায় অভিযুক্ত ২১ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য নির্ধারিত দিন পিছিয়ে আগামী ৩ আগস্ট ধার্য করা হয়েছে। আদালতে এক আসামির করা অনাস্থা আবেদনের শুনানি চলমান থাকায় সাক্ষ্যগ্রহণ স্থগিত রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) ঢাকার ১ম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. আলমগীরের আদালত শুনানি শেষে পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেন। আদালতের বেঞ্চ সহকারী রিয়াজ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এদিন মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য ছিল। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতের প্রতি অনাস্থা সংক্রান্ত আবেদনের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মামলার সব কার্যক্রম স্থগিত রাখার আবেদন করেন। আদালত সেই আবেদন বিবেচনায় নিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ পিছিয়ে আগামী ৩ আগস্ট নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ জুলাই মামলার অন্যতম আসামি মাহমুদুল হাসান মাহিন আদালতের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে আবেদন করেন। তাঁর পক্ষে আইনজীবী মাশরুর হোসাইন আবেদনটি দাখিল করেন। তবে সেই আবেদন এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। অনাস্থা আবেদনের শুনানি চলমান থাকায় মূল মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
মামলাটি রাজধানীতে সংঘটিত সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৯ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের (মিটফোর্ড হাসপাতাল) ৩ নম্বর গেটসংলগ্ন রজনী ঘোষ লেনে একদল ব্যক্তি ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগের ওপর নৃশংস হামলা চালায়। হামলাকারীরা তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে এবং পাথর দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
ঘটনার পরদিন নিহতের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। প্রথমে মামলায় ১৯ জনের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করা হয়। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করা হয়। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে পুলিশ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করে।
তদন্ত শেষে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, তৎকালীন কোতোয়ালি থানার (বর্তমানে শাহবাগ থানায় কর্মরত) অফিসার ইনচার্জ মনিরুজ্জামান আদালতে ২১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। একই সঙ্গে প্রমাণের অভাবে ১০ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।
তবে আদালত তদন্তে কিছু অসংগতি ও ত্রুটি দেখতে পেয়ে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন করে তদন্ত পরিচালনা করেন কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক শাহ মো. ফয়সাল আহমেদ। তদন্ত শেষে চলতি বছরের ১০ মে তিনি আবারও ২১ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরবর্তীতে আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে গত ১২ জানুয়ারি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন এবং বিচার শুরুর নির্দেশ দেন।
মামলার অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন মাহমুদুল হাসান মাহিন, আলমগীর, মনির ওরফে লম্বা মনির, নান্নু কাজী, সজিব বেপারী, টিটন গাজী, তারেক রহমান রবিন, জহিরুল ইসলাম, পারভেজ, সাগর, রিজওয়ান উদ্দিন অভি, রুমান বেপারী, আবির হোসেন, জহির, ইমরান হোসেন, শারাফাত, হোসেন চৌকিদার, জিয়াউদ্দিন রাজিব, সারোয়ার হোসেন টিটু, ছোট মনির ও অপু দাস।
নিহত লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ কেরানীগঞ্জ মডেল থানার পূর্ব নামাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মিটফোর্ড এলাকার রজনী ঘোষ লেনে ভাঙারি ব্যবসা পরিচালনা করতেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে তাঁর মৃত্যু স্বজনদের জীবনে গভীর সংকট সৃষ্টি করেছে বলে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আলোচিত মামলাগুলোতে বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের প্রতি অনাস্থার আবেদন নিষ্পত্তির আগে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলে পরবর্তী সময়ে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই বিচারিক স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থেই আদালত অনাস্থা আবেদনের নিষ্পত্তির অপেক্ষা করছেন।
এদিকে নিহতের পরিবার আশা প্রকাশ করেছে, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর হলেও তারা ন্যায়বিচার পাবেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষ আদালতের মাধ্যমে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ পাওয়ার প্রত্যাশা করছে। ফলে মামলাটির পরবর্তী শুনানি এবং ৩ আগস্ট নির্ধারিত সাক্ষ্যগ্রহণের দিকে এখন সবার দৃষ্টি রয়েছে।