প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রাম-২ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরকে জাতীয় সংসদের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার আবেদন এবং তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে করা আবেদনের ওপর আগামীকাল আদেশ দেবেন আপিল বিভাগ। দেশের রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে আলোচিত এই মামলাটি এখন নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কারণ, এই আদেশ শুধু একজন সংসদ সদস্যের সাংবিধানিক অবস্থানই নয়, বরং নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ নজির হতে পারে বলে মনে করছেন আইন বিশ্লেষকরা।
সোমবার (২৭ জুলাই) প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ শুনানি শেষে আদেশের জন্য মঙ্গলবার দিন ধার্য করেন। আবেদনটি করেছেন একই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন। তিনি আদালতের কাছে আবেদন করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত রাখার পাশাপাশি সরোয়ার আলমগীরকে সংসদের অধিবেশনে যোগ দেওয়া থেকেও বিরত রাখার নির্দেশনা চেয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় গত ১২ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচনকে ঘিরে চট্টগ্রাম-২ আসনটি শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল। নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশন ঋণখেলাপির অভিযোগে বিএনপি প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বাতিল করে। কমিশনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।
প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট সরোয়ারকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি দেন এবং তাঁর পক্ষে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক বরাদ্দের নির্দেশ দেন। ফলে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। তবে পরবর্তী সময়ে আপিল বিভাগের নির্দেশে তাঁর নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়। অর্থাৎ নির্বাচনে অংশ নিলেও তাঁর বিজয় বা পরাজয়ের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
পরে সরোয়ার আলমগীরের রিটের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত ৯ জুলাই হাইকোর্ট নির্বাচন কমিশনের মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। আদালতের ওই রায়ের পরপরই নির্বাচন কমিশন চট্টগ্রাম-২ আসনে সরোয়ারকে বিজয়ী ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে। একই দিন তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথও গ্রহণ করেন।
হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন আপিল বিভাগে আবেদন করেন। তাঁর দাবি, মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে সরোয়ার আলমগীরকে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হলে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়তে পারে। তাই রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত রাখার পাশাপাশি সংসদ অধিবেশনে অংশগ্রহণ থেকেও তাঁকে বিরত রাখার নির্দেশনা প্রয়োজন।
আদালতে জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী। অন্যদিকে বিএনপি নেতা সরোয়ার আলমগীরের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম ও এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। রাষ্ট্রের পক্ষে শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
শুনানি শেষে আইনজীবী আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী সাংবাদিকদের জানান, তাঁদের আবেদনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। প্রথমত, হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত রাখা এবং দ্বিতীয়ত, মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরোয়ার আলমগীরকে সংসদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখা। আপিল বিভাগ বিষয়টি শুনে আগামীকাল আদেশের জন্য দিন নির্ধারণ করেছেন।
আদালতের নথি অনুযায়ী, এই আইনি বিরোধের সূচনা হয় নির্বাচনের আগে। গত ২ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তা সরোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেন। পরে জামায়াতের প্রার্থী নুরুল আমিন নির্বাচন কমিশনে আপিল করে অভিযোগ করেন, সরোয়ার ঋণখেলাপি হওয়ায় তাঁর মনোনয়ন বৈধ হতে পারে না। কমিশন সেই আপিল গ্রহণ করে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়।
এরপর হাইকোর্টে রিট করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান সরোয়ার। পরে এই আদেশের বিরুদ্ধেও আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়। গত ৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে নির্দেশ দেন, সরোয়ার নির্বাচনে জয়ী হলেও আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁর ফলাফল প্রকাশ স্থগিত থাকবে। পরবর্তীতে নিয়মিত আপিলের শুনানিতে আপিল বিভাগ হাইকোর্টকে দ্রুত রিট নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশ অনুসারেই ৯ জুলাই হাইকোর্ট চূড়ান্ত রায় প্রদান করেন।
বর্তমানে মামলাটি আবারও আপিল বিভাগের বিবেচনায় রয়েছে। আগামীকালের আদেশে আদালত হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা আপাতত বহাল রাখবেন নাকি স্থগিত করবেন, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একই সঙ্গে সংসদ সদস্য হিসেবে সরোয়ার আলমগীরের কার্যক্রমে কোনো অন্তর্বর্তী নির্দেশনা আসে কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহল ও আইন বিশেষজ্ঞদের।
সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনী বিরোধে আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশ শুধু সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর অবস্থানই নির্ধারণ করে না, বরং ভবিষ্যতের নির্বাচনসংক্রান্ত আইনি ব্যাখ্যাতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। তাই চট্টগ্রাম-২ আসনের এই মামলার আদেশ রাজনৈতিক ও আইনি—উভয় ক্ষেত্রেই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এখন সবার দৃষ্টি আপিল বিভাগের আগামীকালের আদেশের দিকে। আদালতের সেই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে সরোয়ার আলমগীর আপাতত সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখতে পারবেন কি না এবং নির্বাচনী এই বহুল আলোচিত আইনি লড়াই কোন দিকে মোড় নেবে।