প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শেরপুরের শ্রীবরদীতে দায়ের হওয়া একটি আলোচিত শিশু ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি মো. শামীম মিয়া (২১) দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর চট্টগ্রাম মহানগরী থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-১৪-এর সিপিসি-১, জামালপুর এবং র্যাব-৭, চট্টগ্রামের যৌথ অভিযানে তাকে আটক করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করে কয়েক দিনের পরিকল্পিত অভিযানের মাধ্যমে তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।
ঘটনাটি শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার একটি পরিবারের ভেতরে ঘটে যাওয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মর্মান্তিক অপরাধ হিসেবে আলোচনায় আসে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগী পরস্পরের নিকট আত্মীয়। ফলে পারিবারিক বিশ্বাস ও নিরাপত্তার যে পরিবেশ একজন শিশুর জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হওয়ার কথা, অভিযোগ অনুযায়ী সেই সম্পর্কের অপব্যবহার করেই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।
র্যাব সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত মো. শামীম মিয়া দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে ছিলেন। তার অবস্থান শনাক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন স্থানে গোয়েন্দা নজরদারি চালায়। একপর্যায়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, তিনি চট্টগ্রাম মহানগরীর পতেঙ্গা এলাকায় অবস্থান করছেন। এরপর গত ২৫ জুলাই বিকেলে র্যাব-১৪-এর সিপিসি-১, জামালপুরের সদস্যরা র্যাব-৭, সদর কোম্পানি, পতেঙ্গার সহযোগিতায় দক্ষিণ পতেঙ্গা চরবস্তি এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ছাড়াই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলার এজাহার ও তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৩ আগস্ট ভুক্তভোগীর মা চিকিৎসার জন্য ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। সে সময় শিশুটি তার দাদির কাছে ছিলেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, দাদির অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে অভিযুক্ত ভয়ভীতি প্রদর্শন করে শিশুটিকে ধর্ষণ করেন। শুধু তাই নয়, ঘটনাটির আপত্তিকর ভিডিওও গোপনে ধারণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অভিযুক্ত পরবর্তী সময়ে একাধিকবার একই শিশুকে যৌন নির্যাতনের শিকার করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, চলতি বছরের ৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় ভুক্তভোগী বাড়িতে একা থাকার সুযোগে ভিডিও প্রকাশের হুমকি দিয়ে তাকে আবারও ধর্ষণ করা হয়। এমন অভিযোগ তদন্তকারীদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে, কারণ প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ভুক্তভোগীকে ভয় দেখানোর বিষয়টি শিশু নির্যাতনের ঘটনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দীর্ঘদিন ধরে ভয় ও মানসিক চাপের মধ্যে থাকায় শিশুটি বিষয়টি প্রকাশ করতে পারেনি। পরে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে পরিবারের সদস্যরা আইনের আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ভুক্তভোগীর বাবা শেরপুর শিশু ধর্ষণ অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে শ্রীবরদী থানাকে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে শ্রীবরদী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়। এরপর থেকেই মামলার তদন্ত শুরু হয় এবং অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে অভিযান পরিচালিত হতে থাকে। তবে তিনি এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় তাকে দ্রুত আটক করা সম্ভব হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, অভিযুক্তের সম্ভাব্য অবস্থান শনাক্ত করতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং আন্তঃজেলা সমন্বয়ের মাধ্যমে অনুসন্ধান চালানো হয়। শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রামে তার অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর পরিকল্পিত অভিযান পরিচালনা করে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পলাতক আসামিদের আইনের আওতায় আনতে বিভিন্ন ইউনিটের সমন্বিত প্রচেষ্টা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
শ্রীবরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নুরুল আলম বলেন, র্যাবের কাছ থেকে গ্রেপ্তারের সংবাদ পাওয়ার পর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চট্টগ্রামে গিয়ে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আসামিকে শ্রীবরদী থানায় নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে সোমবার দুপুরে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগ অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এসব মামলায় বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তকে আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা যায় না। তবে এমন অভিযোগের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, মানসিক সহায়তা এবং প্রমাণ সংরক্ষণের বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তদন্ত নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত সম্পন্ন হওয়াও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অন্যতম শর্ত।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্ট মহল দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, পরিবারের ভেতরে সংঘটিত যৌন সহিংসতার ঘটনা অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক লজ্জা, ভয় কিংবা পারিবারিক চাপে প্রকাশ পায় না। ফলে প্রকৃত ঘটনার তুলনায় অভিযোগের সংখ্যা অনেক কম সামনে আসে। এ কারণে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং সমাজের সব স্তরের মানুষের সম্মিলিত সচেতনতা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, ডিজিটাল মাধ্যমে ধারণ করা ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শন বর্তমান সময়ে শিশু ও নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের একটি উদ্বেগজনক দিক। তাই এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের জন্য সহজ আইনি সহায়তা এবং মানসিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। এরপর বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মামলার পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে যাবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করতে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।