চীনা দুই গণিতবিদের ফিল্ডস মেডেল জয়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
  • ১২ বার
চীনা দুই গণিতবিদের ফিল্ডস মেডেল জয়

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গণিতের জগতে নতুন ইতিহাস রচনা করলেন চীনের দুই গবেষক হং ওয়াং ও ইউ দেং। প্রথমবারের মতো চীনের নাগরিক হিসেবে তাঁরা বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ গণিত সম্মাননা ‘ফিল্ডস মেডেল’ অর্জন করেছেন। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত থাকা দুটি জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধানে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁদের এই সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জন পারডন এবং কানাডার জ্যাকব সিমারম্যানও চলতি বছরের ফিল্ডস মেডেল বিজয়ী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।

গণিতে ফিল্ডস মেডেলকে দীর্ঘদিন ধরেই ‘গণিতের নোবেল’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বের ৪০ বছরের কম বয়সী অসাধারণ কৃতিত্বপূর্ণ গণিতবিদদের প্রতি চার বছর পর এই সম্মাননা দেওয়া হয়। চলতি বছরের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রত্যেক বিজয়ীকে ১৫ হাজার কানাডীয় ডলার করে প্রদান করা হয়েছে। তবে অর্থমূল্যের চেয়ে এই সম্মাননার বৈজ্ঞানিক ও একাডেমিক মর্যাদাই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন গবেষকরা।

হং ওয়াংয়ের এই অর্জন আরও একটি কারণে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ফিল্ডস মেডেল ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় নারী বিজয়ী। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে গণিত গবেষণায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও সর্বোচ্চ পর্যায়ের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে নারীদের উপস্থিতি এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত। সেই প্রেক্ষাপটে তাঁর এই সাফল্য বিশ্বজুড়ে নারী গবেষকদের জন্য নতুন অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

হং ওয়াংয়ের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ১৯১৭ সালে জাপানি গণিতবিদ সোইচি কাকেয়া উত্থাপিত বিখ্যাত ‘কাকেয়া সমস্যা’। প্রশ্নটি দেখতে সহজ হলেও শত বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি আধুনিক গণিতের অন্যতম কঠিন সমস্যাগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত ছিল। মূল প্রশ্ন ছিল, একটি সরল রেখাখণ্ড বা পেনসিলকে সম্পূর্ণ একবার ঘুরিয়ে নিতে গেলে সর্বনিম্ন কতটুকু ক্ষেত্রফল প্রয়োজন হয়। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বহু প্রজন্মের গণিতবিদ জ্যামিতি, বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন আধুনিক গাণিতিক তত্ত্বের বিকাশে অবদান রেখেছেন।

হং ওয়াং তাঁর সহকর্মী জশ জালের সঙ্গে মিলে সমস্যাটিকে নতুনভাবে বিশ্লেষণ করেন। তাঁরা সমতল জ্যামিতির পরিবর্তে ত্রিমাত্রিক স্থানকে ভিত্তি করে সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান উপস্থাপন করেন। তাঁদের গবেষণা গত বছর প্রকাশিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক গণিত অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। গবেষকদের মতে, এই ফলাফল শুধু একটি পুরোনো সমস্যার সমাধানই নয়, বরং হারমোনিক অ্যানালাইসিস, জ্যামিতিক পরিমাপ তত্ত্ব এবং আংশিক ডিফারেনশিয়াল সমীকরণসহ বিভিন্ন গবেষণা ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

এক সাক্ষাৎকারে হং ওয়াং বলেন, এই ধারণাটি গবেষকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়, কারণ একই ধরনের গাণিতিক কাঠামো বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সমস্যায় স্বাভাবিকভাবেই দেখা যায়। তাঁর ভাষায়, একটি বিমূর্ত গাণিতিক ধারণা বাস্তব বিশ্বের নানা জটিল ঘটনার ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে ইউ দেংকে সম্মানিত করা হয়েছে হিলবার্টের ষষ্ঠ সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির জন্য। ১৯০০ সালে জার্মান গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট গণিতের ইতিহাসে বিখ্যাত ২৩টি সমস্যা উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে ষষ্ঠ সমস্যাটি ছিল পৃথক পৃথক কণার গতিবিধি থেকে একটি বৃহৎ ভৌত ব্যবস্থার সামগ্রিক আচরণ কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, সেই প্রশ্নকে ঘিরে।

এই সমস্যাটি শুধু গণিত নয়, পদার্থবিজ্ঞান, পরিসংখ্যানগত বলবিদ্যা এবং তরলগতিবিদ্যার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। ইউ দেং গ্যাসের কণার আচরণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে এমন একটি গাণিতিক কাঠামো তৈরি করেন, যা দীর্ঘদিনের এই তাত্ত্বিক সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এনে দেয়। তাঁর গবেষণা ভবিষ্যতে জটিল ভৌত ব্যবস্থা, জলবায়ু মডেলিং এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গণনার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

ফিল্ডস মেডেল অর্জনের পর ইউ দেং বলেন, যাঁদের গবেষণা অনুসরণ করে তিনি বড় হয়েছেন, সেই মহান গণিতবিদদের তালিকায় নিজের নাম যুক্ত হওয়া তাঁর জন্য অত্যন্ত সম্মানের বিষয়। তিনি মনে করেন, এই স্বীকৃতি তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের গবেষণা ও অধ্যবসায়েরও মূল্যায়ন।

চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই গবেষকের এই সাফল্য ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি করেছে। ওয়েইবো, রেডনোটসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাঁদের নিয়ে লক্ষাধিক পোস্ট ও আলোচনা দেখা গেছে। ‘ফিল্ডস মেডেল’ এবং ‘প্রথম চীনা গণিতবিদ হিসেবে ফিল্ডস মেডেল অর্জন’–সংক্রান্ত হ্যাশট্যাগ অল্প সময়েই কোটি মানুষের নজর কেড়েছে। অনেক ব্যবহারকারী এটিকে চীনের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির নতুন মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কেউ লিখেছেন, এটি সমগ্র চীনা জাতির জন্য গর্বের মুহূর্ত। আবার কেউ মন্তব্য করেছেন, তাঁরা ইতিহাসের সাক্ষী হচ্ছেন।

চীনের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোও হং ওয়াং ও ইউ দেংয়ের শিক্ষাজীবন, গবেষণা, ব্যক্তিগত সংগ্রাম এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁদের সাফল্যের পেছনের গল্প তুলে ধরে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্জন আন্তর্জাতিক গবেষণাক্ষেত্রে চীনের ক্রমবর্ধমান অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দেশটির তরুণ শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান ও গণিত গবেষণায় আগ্রহ বাড়াবে।

হং ওয়াংয়ের একাডেমিক যাত্রাও বেশ অনুপ্রেরণাদায়ক। তিনি চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে ভূবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেও এক বছরের মধ্যেই গণিত বিভাগে স্থানান্তরিত হন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য ফ্রান্সে যান এবং প্যারিস-সুদ বিশ্ববিদ্যালয় ও একোল পলিটেকনিকে পড়াশোনা করেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্র হারমোনিক অ্যানালাইসিস, যা তরঙ্গ, সংকেত এবং জটিল গাণিতিক কাঠামোর আচরণ বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হয়।

ইউ দেংয়ের গণিতের প্রতি আগ্রহ শুরু হয় শৈশবেই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালেই তিনি বিভিন্ন গণিত অলিম্পিয়াড ও প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করেন। ২০০৭ সালে তিনি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরে ২০০৯ সালে এমআইটিতে স্থানান্তরিত হয়ে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যান এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০২৪ সাল থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতির এই সময়ে ফিল্ডস মেডেলপ্রাপ্ত গবেষণাগুলো আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যদিও এআই জটিল গণনা ও তথ্য বিশ্লেষণে অভূতপূর্ব সক্ষমতা অর্জন করেছে, তবুও মৌলিক গাণিতিক ধারণা, নতুন তত্ত্ব নির্মাণ এবং গভীর বিশ্লেষণাত্মক চিন্তার ক্ষেত্রে মানব মেধার বিকল্প এখনও তৈরি হয়নি। হং ওয়াং ও ইউ দেংয়ের গবেষণা সেই বাস্তবতারই একটি শক্তিশালী উদাহরণ।

গণিতের ইতিহাসে শতবর্ষের বেশি সময় ধরে গবেষকদের সামনে থাকা দুটি কঠিন সমস্যার সমাধানে এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি বৈশ্বিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্যও একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। আন্তর্জাতিক গবেষণা মহলের বিশ্বাস, তাঁদের এই কাজ ভবিষ্যতে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, প্রকৌশল এবং কম্পিউটেশনাল বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন গবেষণার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি একটি বার্তা বহন করে—দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যারও সমাধান সম্ভব, যদি থাকে নিরলস অধ্যবসায়, সৃজনশীলতা এবং জ্ঞানের প্রতি গভীর নিষ্ঠা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত