এইচ-১বি ভিসার ১ লাখ ডলারের ফি এক বছর বাড়ল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৮ বার
এইচ-১বি ভিসার ১ লাখ ডলারের ফি এক বছর বাড়ল

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য বহুল ব্যবহৃত এইচ-১বি ভিসায় ১ লাখ মার্কিন ডলার ফি আরোপের বিধান আরও এক বছরের জন্য বাড়িয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই বিধিনিষেধ ২০২৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বহাল রাখার কথা রয়েছে। তবে এই ফি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে চলমান আইনি লড়াইয়ের কারণে বাস্তবে এটি কতটা এবং কীভাবে কার্যকর হবে, তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবার নির্দিষ্ট এইচ-১বি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে ১ লাখ ডলারের অর্থপ্রদানের শর্ত আরোপ করে। ওই সিদ্ধান্তের আওতায় মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকা নতুন এইচ-১বি কর্মীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাদের বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। নতুন ঘোষণায় আগের ব্যবস্থাটিই আরও ১২ মাস চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

হোয়াইট হাউসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এইচ-১বি কর্মসূচিতে কিছু নিয়োগকর্তা তুলনামূলক কম বেতনে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করে মার্কিন কর্মীদের জায়গা সংকুচিত করছে—এমন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে এই নীতি নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, বড় অঙ্কের ফি আরোপের মাধ্যমে কর্মসূচির অপব্যবহার কমানো এবং উচ্চ দক্ষতার প্রয়োজনীয় কর্মীদের নিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে মার্কিন শ্রমবাজারে স্থানীয় কর্মীদের সুযোগ সুরক্ষার কথাও তুলে ধরছে ট্রাম্প প্রশাসন।

তবে এই নীতির বিষয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর অবস্থান ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, এইচ-১বি কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গবেষণা ও অন্যান্য বিশেষায়িত খাতে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বড় অঙ্কের অতিরিক্ত ফি আরোপ করলে দক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগে কোম্পানিগুলোর ব্যয় বাড়বে এবং এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা ও প্রযুক্তি খাতের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে বলে তারা মনে করে।

এইচ-১বি ভিসা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষায়িত দক্ষতার বিদেশি কর্মী নিয়োগের সুযোগ দেয়। তথ্যপ্রযুক্তি খাত ছাড়াও প্রকৌশল, গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য পেশাগত ক্ষেত্রে এই ভিসার ব্যবহার রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও চীন থেকে আসা দক্ষ পেশাজীবীরা এই কর্মসূচির বড় অংশ ব্যবহার করে আসছেন। ফলে নতুন ফি ও নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব ওই দেশগুলোর পেশাজীবীদের ওপর বিশেষভাবে পড়তে পারে।

সাধারণ পরিস্থিতিতে এইচ-১বি ভিসার জন্য বিভিন্ন ধরনের সরকারি ফি রয়েছে, যার পরিমাণ আবেদন ও নিয়োগকর্তার ধরন অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। প্রচলিত ব্যয়ের তুলনায় ১ লাখ ডলারের নতুন অর্থপ্রদানের শর্ত অনেক বেশি হওয়ায় বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশ থেকে নতুন কর্মী আনার ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর সিদ্ধান্তে এই অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রভাব পড়তে পারে।

তবে ১ লাখ ডলারের ফি সব ধরনের এইচ-১বি আবেদনকারীর ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকা নির্দিষ্ট নতুন এইচ-১বি কর্মীদের প্রবেশের ক্ষেত্রে এই অর্থপ্রদানের শর্ত বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় ব্যতিক্রমের সুযোগও রাখা হয়েছে। বিদ্যমান এইচ-১বি কর্মীদের ভিসা নবায়ন এবং কিছু শিক্ষার্থী থেকে এইচ-১বি কর্মীতে রূপান্তরের ক্ষেত্রেও আগের মতো পৃথক বিধান রয়েছে।

এই নীতির সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে আদালতের রায়ের কারণে। চলতি বছরের জুনে ম্যাসাচুসেটসের একটি ফেডারেল জেলা আদালত ১ লাখ ডলারের ফি আরোপের আইনি ভিত্তি নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে রায় দেয় এবং বিধানটি বাতিল করে। এরপর মার্কিন সরকার ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। আপিল চলাকালে আদালতের আদেশ ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার কারণে ফি বাস্তবায়নের অবস্থাও পরিবর্তনশীল রয়েছে।

এ কারণে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে মেয়াদ বাড়ালেও আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত নিয়োগকর্তা ও সম্ভাব্য এইচ-১বি কর্মীদের জন্য পরিস্থিতি পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। আইনি প্রক্রিয়ার ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর বাস্তবায়ন নির্দেশনার ওপর নির্ভর করবে নতুন মেয়াদে ফি কীভাবে কার্যকর হবে।

এই ফি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশও আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। ইউএস চেম্বার অব কমার্সসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছে যে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এত বড় অঙ্কের ফি আরোপের আইনগত ক্ষমতা সরকারের রয়েছে কি না, সেটি আদালতের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এ নিয়ে পৃথক আইনি কার্যক্রমও চলছে।

এইচ-১বি কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। একদিকে মার্কিন প্রশাসনের একটি অংশের অভিযোগ, কর্মসূচির মাধ্যমে কিছু প্রতিষ্ঠান কম খরচে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করে স্থানীয় কর্মীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা তৈরি করছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি খাতের সংগঠনগুলোর বক্তব্য, অনেক বিশেষায়িত পদে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত দক্ষ কর্মী পাওয়া যায় না। ফলে বিদেশি দক্ষ কর্মীদের নিয়োগ অর্থনীতি ও উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে।

ট্রাম্প প্রশাসন গত এক বছরে এইচ-১বি কর্মসূচিকে ঘিরে আরও বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে বা পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে কর্মীদের বেতন ও দক্ষতার ভিত্তিতে আবেদন বাছাইয়ের দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি রয়েছে। প্রশাসনের সামগ্রিক অবস্থান হলো, এই কর্মসূচি যেন তুলনামূলক কম দক্ষ বা কম বেতনের শ্রমিক আনার পথ না হয়ে উচ্চ দক্ষতার প্রয়োজনীয় কর্মী নিয়োগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

নতুন সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে চাকরির প্রত্যাশী বিদেশি পেশাজীবীদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব কর্মী যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকে নতুন করে এইচ-১বি ভিসায় যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের নিয়োগকর্তাদের জন্য ব্যয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে যেসব মার্কিন প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে দক্ষ কর্মী নিয়োগের ওপর নির্ভরশীল, তাদেরও ভবিষ্যৎ নিয়োগ পরিকল্পনা নতুন করে মূল্যায়ন করতে হতে পারে।

প্রযুক্তি শিল্পে বিষয়টির প্রভাব নিয়ে আলোচনা সবচেয়ে বেশি। কারণ সফটওয়্যার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, প্রকৌশল ও অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক দক্ষ কর্মীদের নিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। উচ্চ ফি ও অনিশ্চিত অভিবাসন নীতি অব্যাহত থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যতে কর্মী নিয়োগের ধরন, কর্মস্থলের অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক কার্যক্রম নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

তবে শেষ পর্যন্ত ১ লাখ ডলারের ফি স্থায়ীভাবে বহাল থাকবে কি না, সেটি আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে। ট্রাম্প প্রশাসন এক বছরের মেয়াদ বাড়িয়ে তাদের নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করেছে। বিপরীতে ব্যবসায়ী সংগঠন ও অন্যান্য পক্ষ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

ফলে আগামী এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতি, শ্রমবাজার এবং প্রযুক্তি খাতে এইচ-১বি কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে। আদালতের রায়, প্রশাসনের বাস্তবায়ন নীতি এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিক্রিয়া—এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করবে ১ লাখ ডলারের ফি শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত