নবম পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের প্রস্তুতি শেষ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৯ বার
নবম পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের প্রস্তুতি শেষ

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর এখন বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ে (বিজি প্রেস) প্রজ্ঞাপন ছাপার কাজ চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে শনিবার দুপুরের পর যেকোনো সময় নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

নতুন পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন প্রকাশ নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই অপেক্ষা ছিল। গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদন দেওয়ার পর এক সপ্তাহের মধ্যে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের কথা জানানো হয়েছিল। তবে আইনগত যাচাই, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং মুদ্রণসংক্রান্ত কাজ শেষ করতে সময় কিছুটা বেশি লেগেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রজ্ঞাপন এখন প্রকাশের একেবারে শেষ ধাপে রয়েছে।

লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দীন জানিয়েছেন, নতুন বেতন কাঠামোর ভেটিং সম্পন্ন করে গত বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, প্রজ্ঞাপনটি বিজি প্রেসে পাঠানো হয়েছে। এখন প্রজ্ঞাপন ছাপা ও প্রকাশের বিষয়টি বিজি প্রেসের এখতিয়ার। ফলে ঠিক কখন গেজেট প্রকাশ হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে নির্দিষ্ট সময় ঘোষণা করা হয়নি।

নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আগ্রহের অন্যতম কারণ হলো দীর্ঘ সময় পর মূল বেতনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসা। নতুন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। গ্রেডভেদে মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।

নতুন কাঠামো অনুযায়ী, প্রথম থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থাৎ এসব গ্রেডে বিদ্যমান মূল বেতনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে মূল বেতন বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত।

বর্তমানে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা। নতুন পে স্কেলে তা বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। ফলে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতনের কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন আসছে।

নতুন বেতন কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি একবারে পুরোপুরি কার্যকর করা হবে না। মূল বেতন ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হিসেবে ধরা হলেও ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরের মধ্যে মোট তিন ধাপে তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পরও নতুন বেতনের পূর্ণ কাঠামো বাস্তবায়নে পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

বিভিন্ন ভাতার ক্ষেত্রেও নতুন কাঠামোয় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত রয়েছে। এসব ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। পেনশনভোগীদের নিট পেনশনও নতুন কাঠামোর আলোকে ধাপে ধাপে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে নতুন পে স্কেলের প্রভাব শুধু কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরাও এর আওতায় আসবেন।

সরকারের হিসাবে, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতায় পরিবর্তন আসবে। এর ফলে সরকারের বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান বাজেটের মাধ্যমে করার কথা জানিয়েছে সরকার।

এই অতিরিক্ত ব্যয় সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ বেতন ও পেনশন খাতে বড় ধরনের ব্যয় বৃদ্ধি হলে সরকারের নিয়মিত পরিচালন ব্যয়ের ওপর এর প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়বে এবং এর প্রভাব ভোগ ও অভ্যন্তরীণ বাজারেও পড়তে পারে। তবে এর সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি, রাজস্ব আয় এবং সরকারের অন্যান্য ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর।

নতুন পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন প্রকাশে এত সময় লাগার পেছনে মূলত অনুমোদনের পরের প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর নতুন কাঠামোর বিভিন্ন অংশ আইনগতভাবে পরীক্ষা করে দেখা হয়। অর্থ বিভাগ থেকে পর্যায়ক্রমে খসড়ার বিভিন্ন অংশ আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। ভেটিং শেষ হওয়ার পর সেটি সরকারি মুদ্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আগে আইনগত ভাষা, বিধান এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিষয়গুলো যথাযথভাবে যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গেজেট প্রকাশের পর সেটিই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। ফলে এতে কোনো অস্পষ্টতা বা প্রশাসনিক জটিলতা না থাকে, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হচ্ছে।

এদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর বেতন পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া কবে শুরু হবে এবং নতুন কাঠামোর প্রথম ধাপের বেতন কার্যকরভাবে কীভাবে হিসাব করা হবে। বিশেষ করে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন পে স্কেল কার্যকর হিসেবে ধরা হওয়ায় বকেয়া বা সমন্বয়সংক্রান্ত হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল একটি নতুন বেতন কাঠামো। জীবনযাত্রার ব্যয়, দ্রব্যমূল্য, পারিবারিক ব্যয় এবং চাকরির দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন পুনর্নির্ধারণের দাবি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। নতুন পে স্কেল সেই দীর্ঘ আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল হিসেবে সামনে এসেছে।

তবে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত নতুন কাঠামোর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে চূড়ান্তভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাজ মূলত শেষ হয়ে বিজি প্রেসের মুদ্রণ ও আনুষ্ঠানিক প্রকাশের পর্যায়ে রয়েছে। তাই সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত এই গেজেট কখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়, সেটিই এখন সবার নজরে।

সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে নবম জাতীয় পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামোর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে বেতন নির্ধারণ, হিসাব সমন্বয় এবং পর্যায়ক্রমে নতুন সুবিধা বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে যাবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তাই প্রজ্ঞাপন প্রকাশের মুহূর্তটি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত