প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিএনপি যখনই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে, তখনই নারীর ক্ষমতায়ন, নারী শিক্ষা এবং শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী। তিনি বলেছেন, নারীদের শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তোলা গেলে এর সুফল শুধু একটি পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এর প্রভাব পড়ে সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক অগ্রগতিতে।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) কেরানীগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজে এসএসসি পরীক্ষায় কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। কৃতিত্বপূর্ণ ফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার গুরুত্ব, নারীর অগ্রযাত্রা এবং আধুনিক জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের বিভিন্ন দিক নিয়ে বক্তব্য দেন বক্তারা।
রিজভী বলেন, একটি পরিবারকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষিত নারীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন নারী যখন শিক্ষার সুযোগ পান এবং জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেন, তখন তার প্রভাব পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও পড়ে। একই সঙ্গে নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ তৈরি করে। এ কারণে নারীদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা তুলে ধরেন তিনি।
বিএনপির এই নেতা বলেন, দলটি নারীদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নারীদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ স্নাতক বা অনার্স পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণের প্রস্তাব দিয়েছেন। নারীদের শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তোলার মাধ্যমে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
শিক্ষাকে একটি জাতির অগ্রগতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, কোনো দেশই শিক্ষাকে উপেক্ষা করে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে পারে না। শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের পরিচিতি—সবকিছুর ওপর একটি দেশের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা করে রিজভী অভিযোগ করেন, গত ১৭ বছরে শিক্ষাব্যবস্থাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তার দাবি, শিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর প্রভাব সামগ্রিকভাবে দেশের ওপর পড়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার মান নিশ্চিত করার পরিবর্তে পরীক্ষাকেন্দ্রিক কিছু বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রিজভী অভিযোগ করেন, কখনো কখনো ক্ষমতাশালী মহল থেকে ফোন করে শিক্ষার্থীদের পাস করিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চললে শিক্ষাব্যবস্থার স্বাভাবিক পরিবেশ ও মান দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও উঠে আসে।
বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে শিক্ষার্থীদের আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতায় গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সময়ে শুধু প্রচলিত পাঠ্যজ্ঞান দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব নয়। প্রযুক্তির বিভিন্ন শাখায় দক্ষতা অর্জন, নতুন জ্ঞান গ্রহণ এবং পরিবর্তিত কর্মবাজারের উপযোগী সক্ষমতা তৈরি করার সুযোগ শিক্ষার্থীদের দিতে হবে।
রিজভীর ভাষ্য, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষাব্যবস্থায় এমন কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, যার কারণে প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক বিশ্বে বাংলাদেশের তরুণদের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, একটি আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু শ্রেণিকক্ষ ও পাঠ্যবই থাকলেই যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম, উপযুক্ত শিক্ষা পরিবেশ, আধুনিক অবকাঠামো এবং জ্ঞানচর্চার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য প্রস্তুত করলে হবে না; তাদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা বাস্তব জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে। মেধা, সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও জ্ঞানকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর সক্ষমতা তৈরি করা শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত।
রিজভী আরও বলেন, একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; দক্ষ ও শিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি করাও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। আর সেই মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নারীদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো গেলে সমাজের একটি বড় অংশকে দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
তিনি শিক্ষার্থীদের মেধা ও প্রতিভা বিকাশে বিনিয়োগ এবং প্রণোদনা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তার মতে, অনেক শিক্ষার্থীর মেধা ও সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজনীয় সুযোগ, সহায়তা বা উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে তা বিকশিত হয় না। তাই শিক্ষার্থীদের প্রতিভা চিহ্নিত করে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি।
কেরানীগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কৃতী শিক্ষার্থীদের সাফল্যকে কেন্দ্র করে শিক্ষার প্রতি পরিবার ও সমাজের আগ্রহ বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের জন্য এমন আয়োজন তাদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি অন্য শিক্ষার্থীদেরও পড়াশোনায় মনোযোগী হতে অনুপ্রাণিত করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সামনে রিজভীর বক্তব্যে নারী শিক্ষা, শিক্ষার মানোন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং আধুনিক অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় ভিত্তি হিসেবে বিবেচনার পাশাপাশি নারীদের জন্য আরও বিস্তৃত শিক্ষার সুযোগ তৈরির ওপর রাজনৈতিক গুরুত্বারোপের বিষয়টি সামনে আসে।
দেশের তরুণ প্রজন্মকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, মানসম্মত শিক্ষা এবং প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন—এমন কথাই অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন রিজভী। একই সঙ্গে নারীদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং তাদের দক্ষ করে গড়ে তোলার মাধ্যমে পরিবার ও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।