প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেটের ঐতিহ্যবাহী হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্স ও দানের ডেগে জমা হওয়া অর্থ চতুর্থবারের মতো প্রকাশ্যে গণনা শুরু হয়েছে। শনিবার সকাল থেকে মাজার প্রাঙ্গণে শুরু হওয়া এই কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ছিল ব্যস্ততা। মাজারের আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গঠিত কমিটির তত্ত্বাবধানে দানের অর্থ, দেশি-বিদেশি মুদ্রা এবং অন্যান্য সামগ্রীর হিসাব করা হচ্ছে।
প্রায় সাড়ে সাতশ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এই মাজারে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসেন। ধর্মীয় বিশ্বাস ও মানতের অংশ হিসেবে অনেকেই দানবাক্সে নগদ অর্থের পাশাপাশি বিদেশি মুদ্রা, স্বর্ণালংকার, রুপার সামগ্রীসহ বিভিন্ন জিনিস দান করেন। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা এসব দানের হিসাব নির্দিষ্ট সময় পরপর প্রকাশ্যে গণনার উদ্যোগ এবারও অব্যাহত রাখা হয়েছে।
শনিবারের গণনা কার্যক্রমে মাদরাসার শিক্ষার্থী, মাজার পরিচালনা কমিটির সদস্য, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্টরা অংশ নিয়েছেন। জেলা প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করে এবারও অর্থ গণনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গণনা শেষে পাওয়া নগদ অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রীর পরিমাণ নির্ধারণ করে সেগুলোর হিসাব সংরক্ষণ করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এর আগে সর্বশেষ গত ১৫ আগস্ট মাজারের দানবাক্স ও দানের ডেগ খোলা হয়েছিল। সেদিন গণনা শেষে পাওয়া যায় ৭০ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭২ টাকা। এর সঙ্গে বিভিন্ন দেশের মুদ্রা এবং স্বর্ণ ও রুপার সামগ্রীও পাওয়া যায়। এর আগে ১১ জুলাই দ্বিতীয় দফায় প্রকাশ্যে গণনা করে পাওয়া হয়েছিল ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা। সেবারও নগদ অর্থের পাশাপাশি স্বর্ণ, রুপা ও বিভিন্ন দেশের মুদ্রা পাওয়া যায়।
চলতি বছরের প্রথম দফায় গত ২২ জুন মাজারের দানবাক্স ও দানের ডেগ খুলে প্রকাশ্যে অর্থ গণনা করা হয়েছিল। সে সময় নগদ ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা পাওয়া যায়। পরে জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে ৫ লাখ টাকা যোগ হওয়ায় ওই দফায় মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। প্রথম দফাতেও বিভিন্ন দেশের মুদ্রার পাশাপাশি স্বর্ণের সামগ্রী পাওয়া গিয়েছিল।
গত তিন দফার হিসাব একত্র করলে মাজারের দানবাক্স ও দানের ডেগ থেকে পাওয়া নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৪০ লাখ ৬৪ হাজার ৩৭৪ টাকা। এর বাইরে প্রতিবারই বিদেশি মুদ্রা, স্বর্ণ ও রুপার বিভিন্ন সামগ্রী পাওয়া গেছে। ফলে শুধু নগদ অর্থ নয়, দানবাক্সে জমা হওয়া অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীর হিসাবও এবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মাজারের আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগের অংশ হিসেবে চলতি বছর থেকে দানের অর্থ গণনা ও সংরক্ষণে প্রশাসনিক তদারকি জোরদার করা হয়েছে। এর আগে দীর্ঘ সময় পরপর দানবাক্স খোলার যে রীতি ছিল, তার পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে অর্থ গণনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এতে দানের অর্থের হিসাব সংরক্ষণ, জমা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নেওয়ার পর গত জুনে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। একই সময়ে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী দানের ডেগ ও একটি দানবাক্স সিলগালা করা হয়েছিল। এরপর পর্যায়ক্রমে সেগুলো খুলে প্রকাশ্যে অর্থ গণনা করা হচ্ছে। গণনা শেষে পাওয়া অর্থ জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মাজারের নামে নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে জমা রাখার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
এবারের গণনা ঘিরেও মাজার প্রাঙ্গণে উৎসুক মানুষের উপস্থিতি দেখা গেছে। কারণ দানবাক্সে সাধারণত শুধু বাংলাদেশি টাকা নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুদ্রা পাওয়া যায়। অনেক ভক্ত তাদের মানত ও ধর্মীয় অনুভূতির অংশ হিসেবে স্বর্ণের অলংকার, রুপার সামগ্রী কিংবা অন্যান্য মূল্যবান জিনিসও দান করেন। ফলে অর্থ গণনার পাশাপাশি এসব সামগ্রী শনাক্ত ও হিসাবের কাজও করতে হয়।
এর আগে দ্বিতীয় দফার গণনায় নগদ অর্থের পাশাপাশি ৯ গ্রাম সোনা, ১০ গ্রাম সোনাসদৃশ বস্তু এবং ৩৯ দশমিক ৪ গ্রাম রুপা পাওয়া গিয়েছিল। একই সময় মাজারে দান হিসেবে একটি গরু ও ৬৫টি ছাগলও পাওয়া যায়। এসব দানের ব্যবস্থাপনাও করা হয়। গরু ও ৪০টি ছাগল রান্না করে মাজারের ভক্ত ও অনুরাগীদের মধ্যে খাবার হিসেবে বিতরণ করা হয়েছিল। বাকি ২৫টি ছাগল বিক্রি করে ১ লাখ ১৫ হাজার ৪০৩ টাকা পাওয়া যায়।
সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজার শুধু ধর্মীয় অনুভূতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান নয়, এটি সিলেটের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পর্যটনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এখানে আসেন। বিদেশ থেকেও দর্শনার্থীদের আগমন ঘটে। বিশেষ করে বিভিন্ন ধর্মীয় উপলক্ষ ও ছুটির সময়ে মাজার এলাকায় মানুষের উপস্থিতি আরও বেড়ে যায়।
এই বিপুল মানুষের দান থেকেই প্রতিবছর মাজারের দানবাক্সে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ জমা হয়। সেই অর্থের সঠিক হিসাব রাখা এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি তাই দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছর প্রকাশ্যে পরপর চারবার অর্থ গণনার উদ্যোগ সেই ব্যবস্থাপনাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রকাশ্যে অর্থ গণনার ফলে দানের অর্থের পরিমাণ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কাছেও একটি ধারণা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রশাসনের উপস্থিতিতে গণনা হওয়ায় অর্থ সংরক্ষণ ও হিসাবের বিষয়ে জবাবদিহির সুযোগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়মিতভাবে এ ধরনের গণনা ও হিসাব সংরক্ষণ করা হলে মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আরও বাড়তে পারে।
তবে প্রতিবারের গণনার মতো এবারও চূড়ান্ত হিসাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত মোট কত টাকা, কত বৈদেশিক মুদ্রা এবং কী পরিমাণ স্বর্ণ বা রুপার সামগ্রী পাওয়া গেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। গণনা শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব তথ্য জানাবে।
সিলেটের মানুষের কাছে শাহজালাল (রহ.) মাজারের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু বছরের আবেগ ও ঐতিহ্য। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী এখানে দান করেন। সেই দানের অর্থ ও সামগ্রীর হিসাব যত বেশি স্বচ্ছতার সঙ্গে সংরক্ষণ করা যাবে, ততই মাজারের ব্যবস্থাপনার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে। চতুর্থ দফার প্রকাশ্য গণনাও সেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।