প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এখন শিক্ষাজীবনের নানা ক্ষেত্রেও দ্রুত বাড়ছে। পড়াশোনা, গবেষণা কিংবা তথ্য খোঁজার কাজে এ প্রযুক্তি যেমন শিক্ষার্থীদের সহায়তা করছে, তেমনি পরীক্ষায় এর অননুমোদিত ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ভারতের মুম্বাইয়ের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) বোম্বে ক্যাম্পাসে চ্যাটজিপিটির সাহায্য নিয়ে পরীক্ষায় উত্তর খোঁজার অভিযোগ ওঠার পর এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু সেই বিতর্ককে আরও গভীর করেছে।
আইআইটি বোম্বের পোওয়াই ক্যাম্পাসে শুক্রবার এ ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃত শিক্ষার্থীর নাম সাহিল ওয়াকোড়ে। তিনি ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জি সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরীক্ষা চলাকালে তিনি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের কিছু অংশ চ্যাটজিপিটিতে দিয়ে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।
ঘটনার পর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও বিভাগীয় প্রধানের নজরে আসে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে তখন কোনো আনুষ্ঠানিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও বিভাগীয় প্রধান তার সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিস্থিতি নিয়ে তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। তাকে জানানো হয়, ওই ঘটনার কারণে তার একাডেমিক ক্যারিয়ারে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
এরপর সাহিল তার আবাসিক হলের কক্ষে ফিরে যান। পরে সন্ধ্যার দিকে তাকে সেখানে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ ও ঘটনাপ্রবাহ এখন তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ফলে পরীক্ষায় চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের অভিযোগ এবং তার মৃত্যুর মধ্যে সরাসরি কোনো কারণ-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা এখনই সম্ভব নয়।
আইআইটি বোম্বে এক বিবৃতিতে শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এই ঘটনায় সাহিলের বন্ধু, সহপাঠী, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের পাশে থাকার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মৃত্যুর পেছনের পরিস্থিতি উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার পর ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দেয়। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের কাছে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ করেন। তাদের অভিযোগ, সাহিলের সঙ্গে ঘটনার আগে কী ধরনের আলোচনা হয়েছিল এবং তার বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, সে বিষয়ে প্রশাসনের বক্তব্য ও শিক্ষার্থীদের জানা তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের একটি অংশের দাবি, পরীক্ষায় অননুমোদিতভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিযোগের কারণে সাহিলকে এক বছরের জন্য বহিষ্কারের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তাদের আরও দাবি, এ ধরনের শাস্তি কার্যকর হলে তাকে আবাসিক হল ছাড়তে হতে পারত এবং তার পড়াশোনার সময়ও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত হয়নি এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত বক্তব্যে এমন কোনো আনুষ্ঠানিক শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়নি।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, একটি প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা পরিবেশে শাস্তির আশঙ্কা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কোনো শিক্ষার্থী যখন নিজের একাডেমিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে, তখন পরিস্থিতি তার জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে সাহিলের মৃত্যুর ক্ষেত্রে ঠিক কী কী বিষয় কাজ করেছে, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
আইআইটি বোম্বের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একাডেমিক প্রতিযোগিতা ও প্রত্যাশার চাপ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। ভালো ফলাফল, নির্ধারিত সময়ে কোর্স শেষ করা, গবেষণা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের সামনে নানা ধরনের চাপ থাকে। এর সঙ্গে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, আবাসিক সুবিধা হারানোর আশঙ্কা কিংবা পড়াশোনা দীর্ঘায়িত হওয়ার ভয় যুক্ত হলে কোনো কোনো শিক্ষার্থীর কাছে পরিস্থিতি আরও কঠিন মনে হতে পারে।
সাহিলের মৃত্যুর ঘটনা সেই বৃহত্তর প্রশ্নটিকেও সামনে এনেছে—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ উঠলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি শিক্ষার্থীর মানসিক ও ব্যক্তিগত অবস্থাকেও কীভাবে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, একাডেমিক সততা নিশ্চিত করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শিক্ষার্থীদের ভুল বা অনিয়মের ঘটনায় পরামর্শ, কাউন্সেলিং এবং সহায়তার সুযোগ রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
চ্যাটজিপিটির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণে শিক্ষাব্যবস্থার সামনে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা কোথায় এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবেন, কোথায় পারবেন না এবং পরীক্ষার সময় প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমা কী—এসব বিষয়ে প্রতিষ্ঠানভেদে নীতিমালা তৈরি হচ্ছে। পরীক্ষায় এআই ব্যবহার করে উত্তর সংগ্রহ করা একাডেমিক সততার প্রশ্ন তৈরি করে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের এ প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ও বৈধ ব্যবহার শেখানোও এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে উঠেছে।
ঘটনার পর আইআইটি বোম্বের ক্যাম্পাসে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রশাসনের আলোচনা চলার সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। পুলিশের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মামলাটির তদন্ত চলছে।
সাহিলের মৃত্যু নিয়ে ক্যাম্পাসে নানা প্রশ্ন উঠলেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো পক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ এবং প্রশাসনের বক্তব্যের মধ্যে যেসব পার্থক্য রয়েছে, সেগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
ঘটনাটি একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার গুরুত্বও সামনে এনেছে। শিক্ষার্থীরা যেন একাডেমিক ব্যর্থতা, নিয়মভঙ্গের অভিযোগ বা শাস্তির আশঙ্কাকে জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখেন, সে জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহজলভ্য সহায়তা ব্যবস্থা থাকা জরুরি। শিক্ষক, সহপাঠী, পরিবার এবং কাউন্সেলিং সেবার সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ থাকলে সংকটের মুহূর্তে একজন শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে পারেন।
আইআইটি বোম্বেতে সাহিলের মৃত্যুর ঘটনা এখন তদন্তাধীন। পরীক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে একাডেমিক নীতিমালা, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ—তিনটি বিষয়ই এ ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তদন্তের ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী তথ্যের অপেক্ষা করতে হবে।
একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, তার বন্ধু, সহপাঠী, শিক্ষক এবং পুরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যও গভীর আঘাতের ঘটনা। তাই ঘটনাটির সত্যতা উদঘাটনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের সংকটের সময়ে কীভাবে আরও কার্যকর সহায়তা দেওয়া যায়, সেই প্রশ্নও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।