যুক্তরাষ্ট্র-ইইউতে বাংলাদেশের পোশাকের রপ্তানি বাড়ছে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার
যুক্তরাষ্ট্র-ইইউতে বাংলাদেশের পোশাকের রপ্তানি বাড়ছে

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় দুই বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে আগস্ট মাসে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দুই বাজারের একটিতে রপ্তানি কমলেও আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২৬ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে ৯ শতাংশের বেশি রপ্তানি বেড়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পরও বাড়তি ব্যয় করে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠানোর চেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের ধরে রাখার কৌশল এই প্রবৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে বাংলাদেশ মোট ৩৬১ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই মাসের তুলনায় এই রপ্তানি ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্ট মিলিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৫০ কোটি ডলারে। এই সময়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৫ শতাংশ।

তবে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বড় বাজারগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে একটি মিশ্র চিত্রও পাওয়া যায়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানি কমেছিল। কিন্তু আগস্টে দুই বাজারেই আবার প্রবৃদ্ধি ফিরেছে। এ কারণে রপ্তানিকারকেরা এটিকে বাজার ধরে রাখার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে তারা বলছেন, উৎপাদন খাতে জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যৎ রপ্তানিতে চাপ তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ৮১ কোটি ৭১ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই মাসের তুলনায় এ রপ্তানি বেড়েছে ২৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ। জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মোট ১৬১ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৪২ শতাংশ বেশি।

২০২৫–২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৭৭৪ কোটি ডলারের বেশি ছিল। দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন বাজার বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের অন্যতম প্রধান ভরসা হিসেবে রয়েছে। তবে চলতি বছর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি, শুল্ক এবং ক্রয়াদেশের পরিবর্তনের কারণে বাজারটি নিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে সতর্কতা রয়েছে।

মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের পরিসংখ্যানে আবার ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। ওই তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ কমেছে। ফলে বিভিন্ন সংস্থার হিসাবের সময়কাল ও তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিগত পার্থক্যের কারণে রপ্তানির প্রকৃত প্রবণতা নির্ধারণে কিছুটা সময় লাগতে পারে।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে পার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। বাংলাদেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, যুক্তরাষ্ট্রের ওটেক্সা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরোস্ট্যাট আলাদা পদ্ধতি ও সময়সীমা অনুসরণ করে তথ্য প্রকাশ করে। ফলে এক মাসের তথ্যের ভিত্তিতে পুরো বাজারের দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নির্ধারণ না করে কয়েক মাসের ধারাবাহিক পরিসংখ্যান দেখা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সঙ্গে ওটেক্সা ও ইউরোস্ট্যাটের তথ্যের পার্থক্য রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পরবর্তী তথ্য হাতে এলে প্রকৃত পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হবে। তার মতে, গত মাসে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলেও উদ্যোক্তারা বাড়তি ব্যয় করে নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি করার চেষ্টা করেছেন।

দেশীয় পোশাক উদ্যোক্তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শুল্কনীতি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের কারণে পোশাক আমদানির বাজারে প্রতিযোগিতার ধরন বদলেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শুল্কহার কিছু প্রতিযোগী দেশের তুলনায় তুলনামূলক সুবিধাজনক হওয়ায় ভবিষ্যতে নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

তবে চীনের পোশাক খাত থেকে সরে যাওয়া ক্রয়াদেশের বড় অংশ বাংলাদেশে না এসে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলোতে যাওয়ার বিষয়টিও উদ্যোক্তাদের ভাবাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক উৎপাদনে বাংলাদেশের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘ লিড টাইমের কথা উল্লেখ করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে বিশ্ববাজারে ফাস্ট ফ্যাশনের চাহিদা বাড়ায় দ্রুত উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা ক্রেতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারেও আগস্টে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ওই মাসে ইইউতে ১৫৬ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। আগের বছরের একই মাসের তুলনায় এ রপ্তানি ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ বেশি।

এর আগে জুলাইয়ে ইইউর বাজারে রপ্তানি ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ কমেছিল। ওই মাসে বাংলাদেশ প্রায় ১৯৩ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। ফলে জুলাইয়ের দুর্বলতার পর আগস্টের প্রবৃদ্ধি ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে সাময়িক গতি ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ইইউতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৩৪৯ কোটি ডলারের। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই রপ্তানি ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি। এর আগে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। তবে আগের অর্থবছরের তুলনায় সেখানে ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ কম রপ্তানি হয়েছিল।

ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যানেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমেছে বলে ওই তথ্য থেকে জানা যায়। এই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১ হাজার ৩৭ কোটি ডলার।

ফলে আগস্টের প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাতের সামনে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ক্রেতাদের মূল্যসংবেদনশীলতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং পোশাকের চাহিদার পরিবর্তন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

এর সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন পরিস্থিতিও সরাসরি যুক্ত। গত কয়েক মাসে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকটে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। তৈরি পোশাক কারখানাগুলোও এর বাইরে ছিল না। গ্যাসের চাপ কমে গেলে বয়লার, ডাইং, ওয়াশিং ও অন্যান্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি হয়। বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলেও উৎপাদন সময়সূচি এবং রপ্তানি ডেলিভারি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে উদ্যোক্তাদের একটি অংশ বাড়তি খরচ করে বিকল্প উপায়ে উৎপাদন ও সময়মতো পণ্য পাঠানোর চেষ্টা করেছেন। কারণ আন্তর্জাতিক পোশাক ব্যবসায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে ক্রেতার আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একটি ক্রয়াদেশ সময়মতো পূরণ করা ভবিষ্যতের আরও ক্রয়াদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।

মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক দুই দিনে কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ তুলনামূলক সন্তোষজনক ছিল। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে পোশাক উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশা করছেন। তার মতে, উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলে বিদেশি ক্রেতারাও বাংলাদেশ থেকে নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি আস্থা পাবেন।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্প দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বড় বাজারে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি শুধু পোশাক কারখানার জন্য নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এক মাসের প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের চূড়ান্ত সূচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা, শুল্কনীতি, প্রতিযোগী দেশের সক্ষমতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি পরিস্থিতি—সবকিছু মিলিয়েই রপ্তানির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।

আগস্টের পরিসংখ্যান তাই পোশাকশিল্পে কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিলেও সামনে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। উৎপাদন নির্বিঘ্ন রাখা, দ্রুত সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানো, কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের উৎপাদন বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখার ওপর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরবর্তী গতি অনেকটাই নির্ভর করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত