প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে ডিজিটাল লেনদেনকে আরও দ্রুত, সহজ ও গ্রাহকবান্ধব করতে বাংলা কিউআর কোডভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থায় নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার করে কোনো পেমেন্ট করা হলে সেই অর্থ আর অপেক্ষমাণ অবস্থায় না রেখে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট মার্চেন্টের হিসাবে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার বা পিএসপি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মোবাইল অ্যাপে বাংলা কিউআর পেমেন্টের সুবিধা আরও দৃশ্যমান ও সহজলভ্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট-১ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, দেশে বাংলা কিউআরভিত্তিক ডিজিটাল লেনদেনকে জনপ্রিয় করা এবং ব্যবসায়ী বা মার্চেন্টদের পেমেন্ট গ্রহণে উৎসাহিত করার লক্ষ্যেই নতুন এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দোকান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সেবা প্রদানকারীসহ বাংলা কিউআর সুবিধা গ্রহণকারী মার্চেন্টরা গ্রাহকের কাছ থেকে পেমেন্ট পাওয়ার পর অর্থ দ্রুত তাদের হিসাবে পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
বর্তমানে ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে অনেক গ্রাহক মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংক অ্যাপ ব্যবহার করে সরাসরি পেমেন্ট করেন। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পেমেন্ট সম্পন্ন হওয়ার পর মার্চেন্টের হিসাবে অর্থ জমা হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করতে হয়। নতুন ব্যবস্থায় সেই অপেক্ষার সময় কমিয়ে তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে কোনো পণ্য কেনা বা সেবা গ্রহণের পর গ্রাহক পেমেন্ট সম্পন্ন করলে মার্চেন্টের জন্য লেনদেনের অর্থ পাওয়ার বিষয়টি আরও দ্রুত নিশ্চিত হওয়ার কথা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে সব বাংলা কিউআর কোডভিত্তিক পেমেন্টের অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট মার্চেন্ট হিসাবে প্রদান করতে হবে। একই তারিখ থেকে ২৪ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে জারি করা সংশ্লিষ্ট নির্দেশনার কার্যকারিতাও বাতিল বলে গণ্য হবে।
নতুন নির্দেশনার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বাংলা কিউআর ব্যবহারের সুবিধা সহজে খুঁজে পাওয়ার ব্যবস্থা করা। ব্যাংক, এমএফএস, পিএসপি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মোবাইল অ্যাপের হোম পেজে বাংলা কিউআর পেমেন্টের আইকন দৃশ্যমান রাখতে বলা হয়েছে। ব্যবহারকারীরা যাতে সহজেই অ্যাপের মাধ্যমে কিউআর পেমেন্টের সুবিধা খুঁজে পান, সে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগের নির্দেশনায় নির্ধারিত বাংলা কিউআর লোগো অনুযায়ী আইকন প্রদর্শন করতে হবে।
বিশেষ করে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহারকারীদের জন্য এই পরিবর্তনের গুরুত্ব রয়েছে। দেশে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ বিভিন্ন এমএফএস সেবার মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ আর্থিক লেনদেন করে থাকেন। দোকানে কেনাকাটা, বিভিন্ন ধরনের বিল পরিশোধ, সেবা গ্রহণ কিংবা ব্যবসায়িক লেনদেনে মোবাইলভিত্তিক পেমেন্টের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। বাংলা কিউআর ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল পেমেন্টকে একটি আন্তঃপরিচালনযোগ্য কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলা কিউআর ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, একজন গ্রাহক তার ব্যবহৃত অনুমোদিত ব্যাংক বা আর্থিক সেবার অ্যাপ থেকে নির্দিষ্ট কিউআর কোড স্ক্যান করে মার্চেন্টকে অর্থ পরিশোধ করতে পারেন। এতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা পেমেন্ট পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। ফলে একই মার্চেন্টের কাছে বিভিন্ন ধরনের গ্রাহক তাদের নিজ নিজ ব্যাংক, এমএফএস বা পেমেন্ট অ্যাপ ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধ করতে পারেন।
নতুন নির্দেশনায় গ্রাহকের অ্যাপ ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চায় বাংলা কিউআর পেমেন্টের আইকন এমন জায়গায় রাখা হোক, যাতে ব্যবহারকারীরা সহজেই সেটি দেখতে ও ব্যবহার করতে পারেন। এ কারণে মোবাইল অ্যাপের হোম পেজে ব্যবহারকারীর হাতের সহজ নাগালের বা ‘থাম্ব জোন’ এলাকায় বাংলা কিউআর পেমেন্টের আইকন রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলা কিউআর স্ক্যানের মাধ্যমে পেমেন্ট সম্পন্ন করার সুবিধা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ গ্রাহক যেন সংশ্লিষ্ট অ্যাপ ব্যবহার করে মার্চেন্টের বাংলা কিউআর কোড স্ক্যান করতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে পেমেন্ট সম্পন্ন করতে পারেন, সে ব্যবস্থা করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলারে কার্ড হিসাবের বাইরে থাকা সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাবধারীদের জন্যও মোবাইল অ্যাপ থেকে বাংলা কিউআর স্ক্যান করে পেমেন্ট করার সুবিধা নিশ্চিত করার নির্দেশনা রয়েছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ক্ষুদ্র দোকানদার, হকার, স্থানীয় সেবাদাতা, রেস্তোরাঁ, ওষুধের দোকান, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যবসা কিংবা বিভিন্ন ছোট উদ্যোক্তারাও এর আওতায় আসতে পারেন। একজন ছোট ব্যবসায়ী যখন দিনের বিভিন্ন সময়ে কিউআর কোডের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করেন, তখন সেই অর্থ দ্রুত হিসাবে জমা হওয়া তার দৈনন্দিন ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নগদ প্রবাহ ব্যবস্থাপনা সহজ করতে পারে।
গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও এর একটি বাস্তব সুবিধা রয়েছে। পেমেন্ট করার পর মার্চেন্টের হিসাবে অর্থ পৌঁছাতে দেরি হলে অনেক সময় লেনদেন সফল হয়েছে কি না, পণ্য বা সেবা সরবরাহ করা যাবে কি না কিংবা পুনরায় পেমেন্টের প্রয়োজন আছে কি না—এসব নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাৎক্ষণিক জমার ব্যবস্থা কার্যকর হলে এ ধরনের অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রতিটি লেনদেনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের উচিত পেমেন্ট সফল হওয়ার বার্তা বা লেনদেনের তথ্য যাচাই করে নেওয়া।
বাংলাদেশে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলা কিউআরকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। চলতি বছর দেশজুড়ে বাংলা কিউআর ব্যবস্থার প্রচার ও সম্প্রসারণে বিভিন্ন কার্যক্রমও নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে, কিউআরভিত্তিক লেনদেনকে শুধু নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের সেবা হিসেবে না রেখে বৃহত্তর ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিস্তৃত করার চেষ্টা চলছে।
নতুন নির্দেশনার ফলে ব্যাংক ও আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও প্রযুক্তিগত ও পরিচালনাগত প্রস্তুতির দায়িত্ব বাড়বে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অ্যাপের ইন্টারফেসে বাংলা কিউআর সুবিধা দৃশ্যমান করা, স্ক্যানভিত্তিক পেমেন্ট কার্যকর রাখা এবং মার্চেন্টের হিসাবে অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে জমা দেওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গ্রাহকের লেনদেনের নিরাপত্তা, সঠিক হিসাব সমন্বয় এবং লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন, ২০২৪-এর ১৮(২) ধারার আওতায় এসব নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, এমএফএস, পিএসপি ও অন্যান্য পেমেন্ট সেবাদাতাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।
সব মিলিয়ে ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআরভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন কার্যকর হতে যাচ্ছে। গ্রাহকের পেমেন্ট এবং মার্চেন্টের হিসাবে অর্থ জমার মধ্যকার সময় কমিয়ে তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালু হলে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার আরও সহজ হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ী ও নিয়মিত ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণকারী মার্চেন্টদের জন্য দ্রুত অর্থপ্রাপ্তি ব্যবসার দৈনন্দিন কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি গ্রাহক ও মার্চেন্ট—উভয়েরই লেনদেনের তথ্য যাচাই, সঠিক কিউআর কোড ব্যবহার এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি হবে।