ইউরোপে বৃহত্তর সংঘাতের শঙ্কা, সতর্ক রবার্ট ফিকো

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার
ইউরোপে বৃহত্তর সংঘাতের শঙ্কা, সতর্ক ফিকো

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউরোপে সামরিক উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বৃহত্তর সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকো। তাঁর ভাষ্য, ইউরোপজুড়ে সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনার দিক থেকে বর্তমান পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুতর ও উত্তেজনাপূর্ণ। একই সঙ্গে নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা ন্যাটোর সদস্য হিসেবে স্লোভাকিয়ার অঙ্গীকার বজায় রাখার কথা জানিয়ে তিনি বলেছেন, তাঁর দেশ যেন কোনো সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য তিনি সম্ভাব্য সবকিছু করবেন।

বৃহস্পতিবার স্লোভাকিয়ার প্রেসোভ শহরে নতুন শিক্ষাবর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে ফিকো এসব মন্তব্য করেন। স্লোভাক সংবাদ সংস্থা টিএএসআর তাঁর বক্তব্যের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সিও তাঁর বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

ফিকোর বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত কয়েক দিনে ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর এসেছে। একই সময়ে ইউক্রেনের প্রতিবেশী ও ন্যাটো সদস্য দেশগুলোও নিজেদের নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়ে সতর্কতা বাড়িয়েছে। ফলে যুদ্ধটি ইউক্রেনের ভূখণ্ডের বাইরে বৃহত্তর ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।

প্রেসোভে বক্তব্য দেওয়ার সময় ফিকো ইউক্রেনের যুদ্ধের বর্তমান গতিপ্রকৃতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের সংঘাত এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে এবং ইউরোপে ক্রমবর্ধমান সামরিক বক্তব্য বা যুদ্ধকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ভাষা তাঁকে উদ্বিগ্ন করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে ইউরোপে শান্তি রয়েছে, কিন্তু সেই শান্তিকে স্থায়ী বা নিশ্চিত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

ফিকোর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ন্যাটো নিয়ে তাঁর অবস্থান। স্লোভাকিয়া ন্যাটোর সদস্য এবং জোটটির প্রতি দেশটির প্রতিশ্রুতি রয়েছে—এ কথা তিনি স্পষ্ট করেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দায়িত্বের জায়গা থেকে স্লোভাকিয়াকে কোনো সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা করার জন্য তিনি চেষ্টা করবেন। অর্থাৎ ন্যাটোর সদস্য হিসেবে আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালন এবং নিজের দেশের সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া এড়ানোর মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাই তুলে ধরেছেন তিনি।

ন্যাটো প্রসঙ্গটি ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জোটটির সদস্যদেশগুলোর নিরাপত্তা কাঠামো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ফলে ইউক্রেনের যুদ্ধ সরাসরি কোনো ন্যাটো সদস্যের ভূখণ্ডে সামরিক হামলার সঙ্গে যুক্ত হলে পরিস্থিতির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত হিসাব অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠতে পারে। ফিকো তাঁর বক্তব্যে এই বৃহত্তর ঝুঁকির কথাই সামনে এনেছেন।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহও ইউরোপের উদ্বেগের পেছনে ভূমিকা রাখছে। ১৭ সেপ্টেম্বর ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন এলাকায় রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া যায়। হামলায় হতাহত ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়েছে বিভিন্ন সূত্র। একই সময়ে পোল্যান্ড, যেটি ন্যাটোর সদস্য এবং ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী, নিজেদের আকাশসীমা ও সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে সতর্কতা দেখিয়েছে।

পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কও ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করেছেন। ইউক্রেনকে সমর্থনকারী ন্যাটো দেশগুলোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হাইব্রিড হামলার ঝুঁকি নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। এসব বক্তব্য ইউরোপের পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধের প্রভাব এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের মাত্রা বোঝায়।

এর মধ্যেই স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইউক্রেন সফরে যাচ্ছেন। টিএএসআরের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর ইউক্রেনে একটি সম্মেলনে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। সেখানে অন্যান্য ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের সরকারপ্রধানদের অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। সফরে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী সেরহি কোরেৎস্কির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের কথা রয়েছে। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কও জানিয়েছেন, ইউক্রেনে ফিকোর সঙ্গে তাঁর দেখা হবে।

ইউক্রেন সফরের আগে ফিকোর বক্তব্য তাই বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। একদিকে তিনি ন্যাটোর সঙ্গে স্লোভাকিয়ার অঙ্গীকারের কথা বলছেন, অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপে বৃহত্তর সংঘাতের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছেন। তাঁর অবস্থান থেকে বোঝা যায়, যুদ্ধের সরাসরি সামরিক প্রভাবের পাশাপাশি সংঘাতের বিস্তারের সম্ভাবনাও তাঁর উদ্বেগের অন্যতম বিষয়।

ফিকো এর আগেও ইউক্রেন ইস্যুতে ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা বলেছেন। জুন মাসে ব্রাসেলসে ইউক্রেন প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছিলেন, ইউক্রেনকে স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দেখতে চায় স্লোভাকিয়া, কারণ প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ইউক্রেনের স্থিতিশীলতা স্লোভাকিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি বলেছিলেন।

এবারের বক্তব্যে ফিকো আরও বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন শান্তি ও সংঘাতের বিস্তার ঠেকানোর ওপর। শিক্ষাবর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি শান্তিকে স্বাভাবিক বা নিশ্চিত বিষয় হিসেবে না দেখার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, বর্তমানে যে শান্তি রয়েছে তা যেন ভবিষ্যতেও বজায় থাকে, সেটিই সবার প্রত্যাশা হওয়া উচিত।

ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘায়িত হওয়া ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়িয়েছে। ন্যাটো সদস্যদেশগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি বিমান প্রতিরক্ষা, ড্রোন মোকাবিলা এবং সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল সামরিক প্রযুক্তি ন্যাটোর প্রচলিত প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকেও নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।

একই সঙ্গে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। ন্যাটোর ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা ব্যয়, ইউরোপীয় দেশগুলোর সামরিক প্রস্তুতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে জোটের ভেতরেও আলোচনা চলছে। ফলে ইউক্রেন যুদ্ধ এখন শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত হিসেবে নয়, ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কাঠামোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে ফিকোর বক্তব্যকে ইউরোপে বৃহত্তর যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে গেছে—এমন ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তিনি মূলত বর্তমান পরিস্থিতির গুরুতরতা এবং সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তাঁর বক্তব্যে স্লোভাকিয়াকে সরাসরি কোনো যুদ্ধে না জড়ানোর আকাঙ্ক্ষা যেমন রয়েছে, তেমনি ন্যাটোর সদস্য হিসেবে দেশটির প্রতিশ্রুতির কথাও রয়েছে।

ইউক্রেন সফরে ফিকোর সামনে তাই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি, ইউরোপের নিরাপত্তা, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, ইউক্রেনকে সহযোগিতা এবং সংঘাতের সম্ভাব্য বিস্তার—এসব বিষয় নিয়ে ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে মতবিনিময় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী টাস্কও ইউক্রেন সফরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞার চাপ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

সব মিলিয়ে রবার্ট ফিকোর সাম্প্রতিক মন্তব্য ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে ইউরোপীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই এর প্রভাব ইউক্রেনের সীমানার বাইরে নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা নীতি ও কূটনীতিতে পড়ছে। স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী সেই বৃহত্তর ঝুঁকির কথাই সামনে এনেছেন। এখন ইউক্রেন সফরে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় তাঁর সতর্কবার্তা কীভাবে প্রতিফলিত হয় এবং সংঘাত কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় কী ধরনের অগ্রগতি হয়, সেদিকেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত