প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের চলমান জ্বালানি চাহিদার মধ্যে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে নতুন করে গ্যাস যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপ থেকে আগামীকাল শনিবার দৈনিক সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের আরও চারটি কূপের কাজ শেষ হলে আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে মোট প্রায় সাড়ে ৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) আওতাধীন তিতাস-২৮ নম্বর কূপের উৎপাদন শুরু হলে দেশীয় উৎস থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নতুন কূপগুলো থেকে গ্যাস পাওয়া গেলে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর নির্ভরতার চাপ কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে নতুন কূপের সম্ভাব্য উৎপাদন এবং জাতীয় পর্যায়ে এর প্রভাব নির্ভর করবে বাস্তব উৎপাদন, গ্রিডে সরবরাহ এবং সামগ্রিক চাহিদার ওপর।
বিজিএফসিএলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিতাস-২৮ নম্বর কূপের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন আগামীকাল করার পরিকল্পনা রয়েছে। উদ্বোধনের পরপরই কূপটি জাতীয় গ্যাস গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করার কথা। কূপটির খননকাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে এবং উৎপাদনে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে।
তিতাস-২৮ কূপটির গভীরতা প্রায় ১৩ হাজার ফুট। সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক মাস আগে কূপটির খননকাজ শেষ হয়। প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিতাস-২৮, তিতাস-২৯, তিতাস-৩০ ও কামতা-২ নম্বর কূপ খননের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তিতাস-২৮ নম্বর কূপটি প্রথম উৎপাদনে যাচ্ছে।
বিজিএফসিএলের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে পুরোনো কূপগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ও চাপ সময়ের সঙ্গে কমে আসছে। ফলে সামগ্রিক উৎপাদন ধরে রাখা এবং জাতীয় গ্রিডে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি তিতাসের ২৯, ৩০ ও ৩১ নম্বর কূপকে ঘিরেও কাজ এগিয়ে চলছে। এসব কূপ সফল হলে দৈনিক উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর মধ্যে তিতাস-২৯ নম্বর কূপের মূল খননকাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে কূপটির লগিংসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম চলছে। এসব কাজ শেষ করে আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে কূপটি উৎপাদনের উপযোগী করার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিতাস-২৯ নম্বর কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে।
তিতাস-৩০ নম্বর কূপের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে কূপটির কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। কূপটি সফলভাবে উৎপাদনে গেলে সেখান থেকেও দৈনিক প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে বলে আশা করছে বিজিএফসিএল।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে তিতাস-৩১ নম্বর গভীর অনুসন্ধান কূপ। চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল এই কূপের খননকাজ শুরু হয়। কূপটির লক্ষ্যমাত্রা গভীরতা ৫ হাজার ৬০০ মিটার, যা প্রয়োজন অনুযায়ী কিছুটা কমবেশি হতে পারে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এর খনন গভীরতা প্রায় ৪ হাজার ৯২০ মিটারে পৌঁছেছে।
গভীরতার কারণে তিতাস-৩১ নম্বর কূপের খনন ও পরবর্তী কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে বেশি সময়সাপেক্ষ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো ধরনের ভূতাত্ত্বিক বা কারিগরি জটিলতা দেখা না দিলে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এর কাজ শেষ করার আশা রয়েছে। কূপটি সফল হলে সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।
তিতাস-৩১ শুধু উৎপাদনের সম্ভাবনার কারণে গুরুত্বপূর্ণ নয়, অনুসন্ধানের দিক থেকেও কূপটির গুরুত্ব রয়েছে। গভীর অনুসন্ধান কূপ হিসেবে এর মাধ্যমে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের আরও গভীর স্তরে গ্যাসের উপস্থিতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, ওই গভীর স্তরে উল্লেখযোগ্য গ্যাসের মজুত থাকতে পারে। তবে নতুন মজুতের পরিমাণ এখনই নিশ্চিত নয়। কূপটির খনন, পরীক্ষা ও বিভিন্ন স্তরের মূল্যায়ন শেষ হওয়ার পরই এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ এমন সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ, সার উৎপাদন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাসের চাহিদা নিয়ে চাপ রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে দেশীয় উৎস থেকে নতুন গ্যাস পাওয়া গেলে তা সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় কিছুটা সহায়তা করতে পারে।
বর্তমানে জাতীয় গ্যাস সরবরাহে দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানি করা এলএনজির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে গেলে চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, আমদানি ব্যয় ও সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার একটি অংশ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। নতুন কূপ থেকে গ্যাস পাওয়া গেলে দেশীয় সরবরাহের অংশ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনও পুরোনো কূপগুলোর চাপ ও মজুত কমে যাওয়ার প্রভাবে ধীরে ধীরে কমছে। বর্তমানে তিতাসের ২৩টি উৎপাদনশীল কূপ থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় ৩৩১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন কূপ যুক্ত করার মাধ্যমে উৎপাদন ধরে রাখার পাশাপাশি সম্ভাব্য নতুন মজুতের সন্ধান করা হচ্ছে।
তিতাস-২৮ থেকে সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার পর তিতাস-২৯, ৩০ ও ৩১ এবং বাখরাবাদ-১১ নম্বর কূপ থেকেও গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, তিতাসের ২৯, ৩০ ও ৩১ নম্বর কূপ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং বাখরাবাদ-১১ থেকে প্রায় ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। তিতাস-২৮-এর সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট যোগ হলে পাঁচটি কূপ থেকে সম্ভাব্য মোট সরবরাহ দাঁড়াতে পারে প্রায় সাড়ে ৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট।
তবে এই পরিমাণকে সম্ভাব্য উৎপাদন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কূপের খনন সফল হওয়া, গ্যাসের চাপ ও মজুত, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল, উৎপাদন অবকাঠামো এবং জাতীয় গ্রিডে সংযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রকৃত সরবরাহ নির্ভর করবে। বিশেষ করে তিতাস-৩১ একটি গভীর অনুসন্ধান কূপ হওয়ায় এর চূড়ান্ত ফলাফল পাওয়ার আগে সম্ভাব্য মজুত বা উৎপাদন সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।
বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের ১১ নম্বর গভীর কূপ নিয়েও পরিকল্পনা রয়েছে। তিতাস-৩১-এর কাজ শেষ হওয়ার পর বাখরাবাদ-১১ নম্বর কূপের খনন শুরু করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কূপটির লক্ষ্যমাত্রা গভীরতা প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মিটার। সফলভাবে খনন ও পরীক্ষা সম্পন্ন হলে সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে।
তিতাস বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুরোনো গ্যাসক্ষেত্র। দীর্ঘদিন ধরে এখান থেকে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস যুক্ত হয়ে আসছে। কিন্তু পুরোনো কূপগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় নতুন অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খননের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। নতুন কূপগুলোর মাধ্যমে একদিকে উৎপাদন ঘাটতি কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে গভীর স্তরে নতুন মজুতের সম্ভাবনাও যাচাই করা হচ্ছে।
জাতীয় গ্রিডে আগামীকাল তিতাস-২৮ থেকে সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়া তাই দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিকভাবে একটি নতুন সরবরাহ উৎস তৈরি করবে। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী তিতাস ও বাখরাবাদের আরও কয়েকটি কূপ উৎপাদনে এলে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ আরও বাড়তে পারে। এতে এলএনজি আমদানির ওপর চাপ কিছুটা কমার সুযোগ থাকলেও দেশের মোট চাহিদার তুলনায় নতুন সরবরাহ কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে কূপগুলোর প্রকৃত উৎপাদন এবং সামগ্রিক গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর।
জ্বালানি নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন কূপ খননের পাশাপাশি বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা, অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা এবং গ্যাসের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। তিতাসের নতুন কূপগুলো থেকে পাওয়া ফলাফল দেশের ভবিষ্যৎ দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও অনুসন্ধান পরিকল্পনাতেও প্রভাব ফেলতে পারে। আপাতত আগামীকাল তিতাস-২৮ থেকে জাতীয় গ্রিডে নতুন গ্যাস যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই প্রক্রিয়ার একটি দৃশ্যমান ধাপ শুরু হচ্ছে।