নভেম্বরে ইউপি ভোট দিয়ে শুরু স্থানীয় নির্বাচন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ২২ বার
নভেম্বরে ইউপি ভোট দিয়ে শুরু স্থানীয় নির্বাচন

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে আবারও শুরু হতে যাচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন (ইসি) আগে অক্টোবর থেকে ভোটগ্রহণ শুরুর পরিকল্পনা করলেও তা পিছিয়ে নভেম্বরে নেওয়ার কথা ভাবছে। তবে ভোটের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে কমিশন।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আগের নির্বাচনগুলোর মতো এবারও একসঙ্গে সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ভোট না নিয়ে ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। এর সঙ্গে পৌরসভা নির্বাচনও যুক্ত করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি কমিশন।

নির্বাচনের সময় নিয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি ভোট আয়োজনের জন্য তুলনামূলকভাবে সহায়ক সময়। তবে কেবল ক্যালেন্ডারের সুবিধাজনক সময় বিবেচনা করেই ভোটের দিন নির্ধারণ করা হবে না। দুর্গাপূজা, রমজান, পাবলিক পরীক্ষা, বার্ষিক পরীক্ষা, আবহাওয়া ও সম্ভাব্য বন্যাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন আয়োজনের সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে।

আগে অক্টোবর মাসকে সামনে রেখে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছিল ইসি। কিন্তু বিভিন্ন বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এখন নভেম্বর থেকে ভোটগ্রহণ শুরুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভোটের অন্তত ৪৫ দিন আগে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। ফলে নভেম্বরের ভোট হলে তার আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও তফসিল ঘোষণার কাজ শেষ করতে হবে।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি অনেকটাই এগিয়ে গেছে। ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, আইন ও বিধিমালার কিছু বিষয় ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রায় সব প্রস্তুতিই শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্রের তালিকা প্রস্তুতের কাজও এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২৭ আগস্ট সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্রের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের কথা রয়েছে। আর ভোটের ২৫ দিন আগে চূড়ান্ত ভোটকেন্দ্রের গেজেট প্রকাশ করা হবে।

ভোটার তালিকা নিয়েও চলছে প্রস্তুতি। নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩১ আগস্ট ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হবে। এরপর তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য আচরণবিধির খসড়াও প্রস্তুত করেছে কমিশন। সংশ্লিষ্ট আচরণবিধি আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছিল। সেটি ইতোমধ্যে কমিশনে ফেরত এসেছে। তবে নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা এবং আইন সংস্কারের বিষয়ে ইসির সুপারিশ এখনো পাঠানো হয়নি। ফলে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার ভিত্তিতেই নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে সরকারের পক্ষ থেকেও বড় ধরনের প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরের মধ্যেই ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন—এই পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য বাজেটে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সরকারের আলোচনা হবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে আগামী সপ্তাহে ইসির সঙ্গে বৈঠক করার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তবে তফসিল এবং ভোটের তারিখ নির্ধারণের চূড়ান্ত ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের হাতেই থাকবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয় নয়, দেশের তৃণমূল প্রশাসন ও নাগরিক সেবার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়। ফলে দীর্ঘ সময় পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হলে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের মধ্যে এ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হতে পারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক সময় তীব্র হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যে সংঘাত, নির্বাচনী বিরোধ এবং সহিংসতার ঘটনা অতীতে দেখা গেছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা শুরু করেছে।

এরই অংশ হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আইজিপি, বিজিবির মহাপরিচালক এবং আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। তাই ভোটের আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রস্তুতি নিতে হবে। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার পরিবেশ এবং নির্বাচনী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি কমিশনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে নিরাপত্তার পাশাপাশি ভোটের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ও সামাজিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। বর্ষাকাল ও বন্যার কারণে দেশের অনেক এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। দুর্গম এলাকার ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনী সরঞ্জাম পৌঁছানো এবং ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের যাতায়াতেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক সময় ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয় এবং শিক্ষকরা ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাই পাবলিক পরীক্ষা ও বার্ষিক পরীক্ষার সময়সূচিও নির্বাচন পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।

ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ফলে নির্বাচন কমিশনের ওপর একসঙ্গে অতিরিক্ত চাপ পড়বে না বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন শেষ করে পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থাকবে। এতে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নির্বাচনী সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৩টি সিটি করপোরেশন, ৪ হাজার ৫৭৩টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৩২৬টি পৌরসভা, ৫০০টি উপজেলা পরিষদ এবং তিন পার্বত্য জেলা বাদে ৬১টি জেলা পরিষদ রয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আয়োজন একটি বড় প্রশাসনিক কার্যক্রম। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে কমিশন।

নভেম্বরে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের যাত্রা শুরু হলে এরপর ধাপে ধাপে অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ভোট আয়োজন করা হতে পারে। তবে কোন প্রতিষ্ঠান কখন ভোটে যাবে, কোন পর্যায়ে কতগুলো নির্বাচন একসঙ্গে হবে এবং পৌরসভা নির্বাচন ইউপির সঙ্গে একই সময়ে অনুষ্ঠিত হবে কি না—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা, ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ, আচরণবিধি ও নির্বাচনী বিধিমালা প্রস্তুত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ এগিয়ে চলছে। নভেম্বরকে সম্ভাব্য সময় ধরে প্রস্তুতি চললেও শেষ পর্যন্ত ভোটের তারিখ নির্ভর করবে কমিশনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ওপর।

তৃণমূলের এই নির্বাচনকে ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা একটি শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর যখন ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা হবে, তখন প্রার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটার—সব পক্ষের দৃষ্টি থাকবে নির্বাচন কমিশনের দিকে। স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্ব নির্ধারণের এই প্রক্রিয়া কতটা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়, সেটিই শেষ পর্যন্ত এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত