নেপালের বন্যায় আটকা অভিনেতা খরাজ মুখোপাধ্যায়

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৮০ বার
নেপালের বন্যায় আটকা অভিনেতা খরাজ মুখোপাধ্যায়

প্রকাশ:  ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নতুন সিনেমার শুটিং করতে গিয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে পড়েছেন টালিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা খরাজ মুখোপাধ্যায়। নেপালের চীন-তিব্বত সীমান্তঘেঁষা রাসুয়া জেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ধসের কারণে যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে সেখানে আটকা পড়েছেন তিনি। তার সঙ্গে রয়েছেন স্ত্রী প্রতিভা মুখোপাধ্যায় এবং সিনেমাটির শুটিং ইউনিটের সদস্যরা। তবে খরাজ ও তার সঙ্গে থাকা সবাই নিরাপদে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

গত ২০ আগস্ট নতুন সিনেমা ‘শিকার’-এর শুটিংয়ের জন্য নেপালে যান খরাজ মুখোপাধ্যায়। শুটিংয়ের জন্য তারা রাসুয়া জেলার দুর্গম পার্বত্য এলাকায় অবস্থান করছিলেন। সেখানে হঠাৎ প্রবল বৃষ্টির পর পাহাড়ি নদীর পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বন্যার পানির তোড়ে বিভিন্ন সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত বা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে শুটিং বন্ধ করে নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান নিতে বাধ্য হন অভিনেতা ও তার সহকর্মীরা।

নেপালের উত্তরাঞ্চলে বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় রাসুয়া ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হিসাবে বৃহস্পতিবার সকাল নাগাদ দুর্যোগে অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষতি, দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকারী দলগুলোকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই আটকা পড়েছেন খরাজ। নিজের পরিস্থিতি সম্পর্কে মুঠোফোনে তিনি জানিয়েছেন, ২৬ আগস্ট তাদের কলকাতায় ফেরার কথা ছিল। কিন্তু বন্যায় রাস্তাঘাট ভেসে যাওয়ায় তারা নির্ধারিত সময়ে ফিরতে পারেননি। যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় স্বাভাবিক যাতায়াতও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিমানের টিকিটও পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তিনি। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে সড়কপথে গোরখপুর হয়ে ২৮ আগস্ট দেশে ফেরার চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন অভিনেতা।

খরাজের বক্তব্যে তার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি দুর্যোগকবলিত এলাকায় আটকে পড়ার বাস্তব চিত্রও ফুটে উঠেছে। একটি সিনেমার শুটিংয়ের উদ্দেশ্যে কয়েক দিনের জন্য নেপালে গিয়ে হঠাৎ এমন ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হবে, তা হয়তো তাদের কারও কল্পনায় ছিল না। শুটিংয়ের ব্যস্ততা মুহূর্তেই থেমে গিয়ে এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য নিরাপদে সেখান থেকে বের হয়ে আসা।

রাসুয়া জেলার এই দুর্যোগ শুধু একটি নির্দিষ্ট এলাকার যোগাযোগব্যবস্থাকেই বিপর্যস্ত করেনি, বরং নেপাল-চীন সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ ও বিভিন্ন অবকাঠামোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নদীর পানি ও ধসের কারণে সড়ক, সেতু, বসতি এবং বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। নেপালের সরকারি ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকালেও বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত ছিল।

দুর্যোগটির ভয়াবহতা এতটাই বেশি যে শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, পর্যটক ও বিদেশি নাগরিকদেরও অনেকে বিভিন্ন এলাকায় আটকা পড়েছেন বা নিখোঁজ রয়েছেন। সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শত শত পর্যটকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নেপালজুড়ে উদ্ধার তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে। দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে হেলিকপ্টারসহ বিভিন্ন ধরনের উদ্ধার সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে।

খরাজ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তার স্ত্রী প্রতিভা এবং শুটিং ইউনিটের সদস্যরা থাকায় তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের কারও আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। বরং তারা নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষা করছেন। যোগাযোগব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তাদের ফেরার পরিকল্পনাও অনিশ্চিত থাকতে পারে।

খরাজের সঙ্গে একই সিনেমার শুটিংয়ে অংশ নিতে নেপালে গিয়েছিলেন অভিনেতা রজতাভ দত্তও। তবে তার অংশের শুটিং আগেই শেষ হয়ে যাওয়ায় দুর্যোগ শুরু হওয়ার আগে তিনি কলকাতায় ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে একই ছবির শুটিং ইউনিটের সদস্যদের মধ্যে একজন নিরাপদে ফিরে এলেও খরাজ, তার স্ত্রী ও অন্য সদস্যরা এখনো নেপালে আটকা রয়েছেন।

‘শিকার’ সিনেমার সঙ্গে বাংলাদেশের দর্শকদেরও আলাদা আগ্রহ রয়েছে। কারণ এই সিনেমায় অভিনয় করছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাস। ফলে খরাজ মুখোপাধ্যায়ের নেপালে আটকা পড়ার খবরটি দুই বাংলার বিনোদন অঙ্গনেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সিনেমাটির শুটিং সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় প্রযোজনা ও নির্মাণ পরিকল্পনাতেও স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব পড়েছে।

এদিকে নেপালের ভয়াবহ বন্যার কারণ নিয়েও বিভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। প্রাথমিকভাবে প্রবল বৃষ্টি ও পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক পানির ঢলকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হলেও পরে স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে বরফ ও পাথরের ধসের সঙ্গে এই আকস্মিক বন্যার যোগসূত্রের কথা উঠে এসেছে। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চীন সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় একটি বরফ-পাথরের ধস থেকে পানির ভয়াবহ প্রবাহ তৈরি হয়ে ভোতে কোশি নদীতে নেমে আসে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই ধরনের পাহাড়ি আকস্মিক বন্যার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো এর গতি ও ব্যাপকতা। পাহাড়ি নদীতে হঠাৎ পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সড়ক, সেতু, ঘরবাড়ি ও যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। রাসুয়ায় এবারও এমন পরিস্থিতিই দেখা গেছে। নদীর পানির প্রবল স্রোত এবং ধসে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় দুর্গম এলাকাগুলোতে আটকে পড়া মানুষদের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত বিভিন্ন জেলা থেকে ১৬২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৪১ জন আহত ব্যক্তি বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। উদ্ধারকারী দলগুলো নদীর তীর, ধ্বংসপ্রাপ্ত সড়ক এবং দুর্গম এলাকাগুলোতে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। নিখোঁজদের সন্ধানে নিরাপত্তা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

খরাজ মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপদে নেপাল থেকে বের হয়ে আসা। নির্ধারিত সময়ে ফিরতে না পারায় তাকে আরও কিছুদিন সেখানে অবস্থান করতে হতে পারে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সড়কপথে বিকল্প রুট ব্যবহার করে দেশে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে তার। তবে বন্যায় সড়ক ও সেতুর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে এই যাত্রাও কতটা সহজ হবে, তা এখনই নিশ্চিত নয়।

একজন অভিনেতার শুটিং আটকে যাওয়ার ঘটনা দিয়ে এই দুর্যোগের পুরো ভয়াবহতা অবশ্যই বোঝা যায় না। কারণ রাসুয়া ও আশপাশের এলাকায় বহু পরিবার স্বজন হারিয়েছে, অনেকে নিখোঁজ এবং অসংখ্য মানুষ ঘরবাড়ি ও জীবিকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। খরাজের মতো বিদেশি অতিথিদের নিরাপদে উদ্ধার করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি স্থানীয় মানুষের জীবন রক্ষা ও নিখোঁজদের সন্ধান করাও এখন নেপালের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।

প্রকৃতির এই আকস্মিক আঘাতে সিনেমার ক্যামেরা থেমে গেছে, শুটিং স্থগিত হয়েছে, ফেরার পরিকল্পনা পিছিয়ে গেছে। কিন্তু দুর্যোগকবলিত মানুষের জীবন স্বাভাবিক করতে নেপালের উদ্ধারকারী দলগুলোকে এখন কঠিন লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। সেই লড়াই শেষ না হওয়া পর্যন্ত খরাজ মুখোপাধ্যায় ও তার সহযাত্রীরাও নিরাপদ আশ্রয়ে অপেক্ষা করছেন। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ২৮ আগস্ট দেশে ফেরার যে আশা তিনি জানিয়েছেন, এখন সেটিই তার ও শুটিং ইউনিটের পরবর্তী লক্ষ্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com