রোজার জন্য বাদ পড়া হাদজাম এবার প্রিমিয়ার লিগে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ বার
রোজার জন্য বাদ পড়া হাদজাম এবার প্রিমিয়ার লিগে

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

তিন বছর আগে রমজানে রোজা রাখার সিদ্ধান্তের কারণে ফ্রান্সের ক্লাব নঁতের স্কোয়াড থেকে বাদ পড়েছিলেন আলজেরিয়ান ফুটবলার জাওয়েন হাদজাম। সেই ঘটনাই একসময় তাকে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছিল। সময়ের সঙ্গে বদলেছে তার ক্যারিয়ার। সুইজারল্যান্ডে নিজেকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করার পর এবার ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রাইটন অ্যান্ড হোভ অ্যালবিয়নে জায়গা করে নিয়েছেন ২৩ বছর বয়সী এই লেফট-ব্যাক।

ব্রাইটন ২৫ আগস্ট হাদজামের সঙ্গে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত চুক্তির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। ক্লাবটি তাকে সুইস চ্যাম্পিয়ন ইয়াং বয়েজ থেকে দলে নিয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ও ফুটবলভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে তার ট্রান্সফার মূল্য প্রায় ৯ দশমিক ৫ মিলিয়ন পাউন্ড বলা হয়েছে। তবে ব্রাইটনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় নির্দিষ্ট ট্রান্সফার ফি প্রকাশ করা হয়নি।

হাদজামের এই পথচলা সহজ ছিল না। প্যারিসে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলার ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলেও খেলেছেন। কিন্তু জাতীয় দলের ক্ষেত্রে তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের বাবা-মায়ের দেশ আলজেরিয়াকে বেছে নেন। ২০২৩ সালে আলজেরিয়ার হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেকের পর তিনি নিয়মিত দলের অংশ হয়ে ওঠেন। এখন পর্যন্ত আলজেরিয়ার হয়ে ২১টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি এবং চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপেও দলের হয়ে তিনটি ম্যাচে মাঠে নেমেছেন।

তবে হাদজামের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের রমজান মাসে। সে সময় তিনি ফ্রান্সের ক্লাব নঁতের হয়ে খেলছিলেন। রমজানে রোজা রাখা নিয়ে ক্লাবের তৎকালীন কোচ আঁতোয়ান কোমবুয়ারের সঙ্গে তার অবস্থানের পার্থক্য তৈরি হয়। ম্যাচের দিন রোজা ভাঙতে অনিচ্ছুক থাকায় তাকে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। ফরাসি সংবাদমাধ্যম এল’একিপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, নঁতের ঘরের মাঠের ম্যাচগুলোতে রোজা না ভাঙার সিদ্ধান্তের কারণে প্রায় এক মাস তিনি মূল স্কোয়াডের বাইরে ছিলেন। পরে পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে তিনি আবার দলের সঙ্গে যোগ দেন।

সেই ঘটনা তখন শুধু ফুটবলীয় সিদ্ধান্তের বিষয় ছিল না; ধর্মীয় বিশ্বাস ও পেশাদার খেলাধুলার সম্পর্ক নিয়েও ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছিল। একজন পেশাদার খেলোয়াড়ের শারীরিক সক্ষমতা, ম্যাচের প্রস্তুতি এবং কোচের কৌশলগত পরিকল্পনার সঙ্গে রমজানের রোজার মতো ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুশীলনের সমন্বয় কীভাবে করা যায়, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছিল।

হাদজাম অবশ্য সেই অধ্যায় পেছনে ফেলে নিজের ফুটবল ক্যারিয়ারে এগিয়ে যান। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তিনি নঁতে ছেড়ে সুইজারল্যান্ডের ইয়াং বয়েজে যোগ দেন। সুইস ক্লাবটিতে যাওয়ার পর তার ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। নিয়মিত খেলার সুযোগ, ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং আক্রমণাত্মক ফুটবলশৈলীর মাধ্যমে তিনি নিজের সক্ষমতা দেখানোর সুযোগ পান। ব্রাইটনের তথ্য অনুযায়ী, ইয়াং বয়েজের হয়ে তিনি ঘরোয়া ও ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৯৮টি ম্যাচ খেলেছেন।

ইয়াং বয়েজে তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের ক্লাবগুলোর নজর কাড়ে। ব্রাইটনের কর্মকর্তারা হাদজামের গতি, আক্রমণাত্মক অবদান, কারিগরি দক্ষতা এবং বহুমুখী সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ব্রাইটনের স্পোর্টিং ডিরেক্টর মাইক কেভ তাকে আধুনিক লেফট-ব্যাক হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছেন, তার খেলার ধরন ক্লাবের কৌশলের সঙ্গে মানানসই।

একজন আধুনিক লেফট-ব্যাকের কাছে শুধু রক্ষণ সামলানোর দক্ষতাই যথেষ্ট নয়। আক্রমণে উঠে যাওয়া, দ্রুত বল এগিয়ে নেওয়া, উইং দিয়ে সুযোগ তৈরি করা এবং প্রয়োজনে মাঝমাঠের সঙ্গে সমন্বয় করে খেলার সক্ষমতাও এখন গুরুত্বপূর্ণ। ইয়াং বয়েজে হাদজামের পারফরম্যান্সে এসব গুণ ফুটে উঠেছে বলেই তাকে ব্রাইটন নিজেদের পরিকল্পনায় যুক্ত করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

সুইস ফুটবলে নিজের অবস্থান শক্ত করার পাশাপাশি ইউরোপীয় প্রতিযোগিতাতেও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন হাদজাম। ইয়াং বয়েজের হয়ে নিয়মিত খেলার ফলে ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। এবার তার সামনে আরও বড় পরীক্ষা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ। ইউরোপের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই লিগে প্রতিটি ম্যাচে গতি, শারীরিক সক্ষমতা, কৌশলগত বোধ এবং ধারাবাহিকতার কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়।

ব্রাইটনে যোগ দিয়ে হাদজাম এখন দলের বাম প্রান্তে জায়গা করে নেওয়ার লড়াইয়ে থাকবেন। সেখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন আরও কয়েকজন খেলোয়াড়। ফলে বড় অঙ্কের ট্রান্সফার ফি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি পেলেই একাদশে নিয়মিত জায়গা নিশ্চিত হচ্ছে না। তাকে অনুশীলন ও ম্যাচে পারফরম্যান্সের মাধ্যমে কোচিং স্টাফের আস্থা অর্জন করতে হবে।

তবে হাদজামের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত এখানে পৌঁছানোর পথটাই। ২০২৩ সালে রমজানে রোজা রাখার কারণে দল থেকে বাদ পড়ার ঘটনা তার ক্যারিয়ারের একটি কঠিন সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে সেই ফুটবলারই এখন ইংল্যান্ডের সবচেয়ে আলোচিত লিগগুলোর একটিতে খেলার সুযোগ পেয়েছেন। তার গল্প তাই শুধু একটি ট্রান্সফারের গল্প নয়; এটি একজন তরুণ ফুটবলারের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পও।

হাদজামের ক্যারিয়ারে জাতীয় দল পরিবর্তনের সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক পর্যায়ে খেলার পর ২০২৩ সালে আলজেরিয়ার হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরপর জাতীয় দলের হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পেয়েছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার হয়ে তিনটি ম্যাচে অংশ নেওয়া তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।

এখন তার সামনে নতুন অধ্যায়। সুইজারল্যান্ডের ইয়াং বয়েজে নিজেকে প্রমাণ করার পর ইংল্যান্ডের ব্রাইটনে তার কাছ থেকে আরও বেশি প্রত্যাশা থাকবে। প্রিমিয়ার লিগের উচ্চ গতি ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারলে হাদজাম নিজের ক্যারিয়ারকে আরও বড় উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেন।

তার গল্পে তাই তিন বছরের ব্যবধান বিশেষভাবে চোখে পড়ে। একসময় ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী রোজা রাখার সিদ্ধান্তের কারণে ম্যাচের স্কোয়াড থেকে বাদ পড়েছিলেন তিনি। সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। কিন্তু সেটি তার পথ থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং পরবর্তী সময়ে নিয়মিত ফুটবল খেলে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জায়গা করে নিয়ে এবং ইয়াং বয়েজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তিনি পৌঁছে গেছেন ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্লাব ফুটবলে।

হাদজামের ব্রাইটনে যোগ দেওয়া তাই তার জন্য শুধু নতুন ক্লাব নয়, নতুন পরীক্ষারও শুরু। সামনে থাকবে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ফুটবল লিগে নিজের সামর্থ্য প্রমাণের সুযোগ। আর তিন বছর আগের সেই ঘটনা এখন তার ক্যারিয়ারের একটি অধ্যায় মাত্র—যেখান থেকে বেরিয়ে এসে তিনি পৌঁছেছেন এমন এক মঞ্চে, যেখানে তার প্রতিটি পারফরম্যান্সই নতুন গল্প তৈরি করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত