নতুন নিষেধাজ্ঞায় যুক্তরাষ্ট্র কিছুই পাবে না: পেজেশকিয়ান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার
নতুন নিষেধাজ্ঞায় যুক্তরাষ্ট্র কিছুই পাবে না: পেজেশকিয়ান

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তার দাবি, অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে তেহরানকে নত করা সম্ভব নয়। বরং অতীতের মতো ভবিষ্যতেও ইরান মার্কিন চাপ মোকাবিলা করে যাবে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইসনাকে দেওয়া এক বক্তব্যে পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে ওয়াশিংটন কোনো অর্জন করতে পারবে না। একইভাবে যুদ্ধের মাধ্যমেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি বলে দাবি করেন তিনি।

পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান এতদিন যেভাবে অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করেছে, ভবিষ্যতেও একইভাবে তা মোকাবিলা করবে। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, নতুন নিষেধাজ্ঞাকে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান চাপ ও পাল্টা চাপের অংশ হিসেবেই দেখছে।

সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন দফার নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইরানের আর্থিক নেটওয়ার্ক এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও নেটওয়ার্ককে লক্ষ্য করেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের আর্থিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হবে।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়ে ইরানের আর্থিক নেটওয়ার্ককে লক্ষ্য করার কথা জানান। একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরানের সঙ্গে নির্দিষ্ট ধরনের বাণিজ্যিক ও আর্থিক লেনদেনে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যতে সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে।

এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর শুধু সরাসরি অর্থনৈতিক চাপই নয়, তৃতীয় দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেও চাপ বাড়াতে চাইছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে ইরানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা, ব্যাংকিং লেনদেন ও বাণিজ্যিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে তেহরানের প্রতিক্রিয়া বলছে, ইরান এ ধরনের চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে প্রস্তুত নয়। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে অর্থনৈতিক প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তিনি মনে করেন, নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেও দেশটি নিজেদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে সক্ষম হবে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সামরিক উত্তেজনা নিয়ে বিরোধ চলছে। সময়ের সঙ্গে এই বিরোধ কখনো কূটনৈতিক আলোচনার দিকে এগিয়েছে, আবার কখনো তা সামরিক উত্তেজনায় রূপ নিয়েছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এই দ্বন্দ্বের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

ইরানের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তেল রপ্তানি, ব্যাংকিং, আর্থিক লেনদেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতকে ঘিরে এসব নিষেধাজ্ঞা তেহরানের ওপর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। এর ফলে ইরানের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেন ও বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির মুদ্রা, মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও অর্থনৈতিক চাপের প্রভাব পড়েছে।

অন্যদিকে ইরানও দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, নিষেধাজ্ঞা দেশটির জনগণের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করলেও রাজনৈতিকভাবে তেহরানকে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করতে পারেনি। পেজেশকিয়ানের সাম্প্রতিক বক্তব্যেও সেই অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত হয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে যুদ্ধের প্রসঙ্গও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সংঘাতের মাধ্যমেও নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। এই মন্তব্যের মাধ্যমে পেজেশকিয়ান বোঝাতে চেয়েছেন, সামরিক কিংবা অর্থনৈতিক—কোনো ধরনের চাপ দিয়েই ইরানকে সহজে নীতিগত অবস্থান থেকে সরানো সম্ভব হবে না।

এদিকে নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কূটনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে। ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়ায় দেশটির ওপর অর্থনৈতিক চাপের প্রভাব শুধু তেহরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ, মূল্য এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যেও এর প্রতিফলন দেখা দিতে পারে।

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি যখন অত্যন্ত সংবেদনশীল, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে এসেছে। নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি যদি রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনাও বাড়ে, তাহলে এর প্রভাব আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর পড়তে পারে।

তবে নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত করা এবং দেশটির নীতিগত সিদ্ধান্তে প্রভাব সৃষ্টি করা সম্ভব। বিপরীতে ইরান মনে করে, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তারা নিজেদের অর্থনীতি পরিচালনা করে আসছে এবং নতুন চাপও মোকাবিলা করা সম্ভব।

পেজেশকিয়ানের বক্তব্য তাই শুধু নতুন নিষেধাজ্ঞার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; এটি ইরানের বৃহত্তর রাজনৈতিক অবস্থানেরও প্রতিফলন। তেহরান যে মার্কিন চাপের সামনে নিজেদের নীতি পরিবর্তন করতে আগ্রহী নয়, তারই ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে এর প্রভাব মোকাবিলা করবে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় নিষেধাজ্ঞার কারণে লেনদেন সীমিত হলে ইরানের ব্যবসা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিকল্প পথ খুঁজতে হতে পারে। একইভাবে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নীতির সঙ্গে নিজেদের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত সামঞ্জস্য করতে হবে।

এর ফলে একদিকে যেমন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে পারে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাদের সামনে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করার চ্যালেঞ্জ থাকতে পারে।

সব মিলিয়ে নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে। ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে তেহরানকে চাপে রাখতে চাইছে, আর ইরানের প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তার দেশ এই চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। সামনে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয় কি না, নাকি নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা অবস্থানের মাধ্যমে উত্তেজনা আরও বাড়ে—এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত